পায়ে পরানো হয়েছে লোহার শিকল, পরনে পাঞ্জাবি এবং মাথায় টুপি। খালি পায়ে মেঝেতে দাঁড়িয়ে কাঁদছে ছয় থেকে সাত বছর বয়সী এক শিশু। একইভাবে শিকলবন্দী অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত করতে দেখা যাচ্ছে আরেক শিশুকে। শিশুদের ওপর এমন অমানবিক নিপীড়নের দুটি স্থিরচিত্র গত শনিবার রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চিত্র দুটি লক্ষ্মীপুরের রামগতি পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত ‘আলেকজান্ডার মাদ্রাসায়ে বাবুত তাকওয়া’ নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। বিগত বছরে একটি ভবনের দোতলা ভাড়া করে মাদ্রাসাটির যাত্রা শুরু হয়, যেখানে বর্তমানে ১৫০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
স্থিরচিত্র ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা শিক্ষার্থী নির্যাতনের আরও কিছু ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে। এমন একটি দৃশ্যে দেখা যায়, কক্ষের দরজা আটকে এক শিক্ষার্থীকে বেধড়ক চড়-থাপ্পড় দিচ্ছেন এক শিক্ষক। একপর্যায়ে ওই শিশুর মাথায় আঘাত করার পাশাপাশি তার শরীরের বিভিন্ন অংশে স্টিলের স্কেল দিয়েও পেটানো হয়। অন্য একটি চিত্রে দেয়ালে চেপে ধরে এক শিশুর মাথায় ক্রমাগত চড়-থাপ্পড় মারতে দেখা গেছে। আরেকটি ভিডিওতে একাধিক শিশুকে দলবদ্ধভাবে প্রহার করার দৃশ্যও ধরা পড়ে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, মাদ্রাসাটিতে প্রায় সময়ই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন নিষ্ঠুর আচরণ করা হতো, তবে ভয়ে শিশুরা পরিবারের কাছে কিছু প্রকাশ করত না। ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর পুরো বিষয়টি সবার সামনে আসে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো প্রায় এক মাস আগের।
ভিডিও ফুটেজে দুজন শিক্ষককে শিশুদের মারধর করতে চিহ্নিত করা গেছে। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন মাদ্রাসাটির প্রধান শিক্ষক মাওলানা হাবিব উল্লাহ, যিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রামগতি পৌরসভা শাখার সভাপতি পদেও রয়েছেন। তবে প্রহারে জড়িত অপর শিক্ষকের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। নির্যাতনের দায় স্বীকার করে শিক্ষক হাবিব উল্লাহ জানান, ‘বিষয়টি আসলে ভুল হয়ে গেছে। ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসন থেকেও আমাদের সতর্ক করা হয়েছে। এটি নিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। অভিভাবকেরা বলেছেন, ভবিষ্যতে এমনটি যেন আর না হয়। ওই শিক্ষার্থীরা এখন মাদ্রাসায় রয়েছে।’
এ প্রসঙ্গে রামগতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিটন দেওয়ান মন্তব্য করেন, ঘটনাটি চরম নিষ্ঠুর এবং মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মাওলানা হাবিব উল্লাহ এতে যুক্ত ছিলেন। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে মামলা দায়েরের পরামর্শ দিলেও তাঁরা রাজি হননি। তিনি উল্লেখ করেন, মামলা ছাড়া এ ঘটনায় কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর লক্ষ্মীপুর জেলা শাখার সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, ‘মাদ্রাসায় কোমলমতি শিশুদের শিকলে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও অমানবিক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষালাভের কথা, সেখানে তাদের ওপর এমন নির্যাতন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’