হেডফোনে বেজে ওঠা মন ছুঁয়ে যাওয়া সুর বা কথামালা যদি কোনো মানুষের সৃষ্টি না হয়ে স্রেফ মেমোরি চিপ আর গাণিতিক কোডের মেলবন্ধনে রচিত হয়, তবে বিস্মিত হওয়াই স্বাভাবিক। চিত্রকলা, গল্প বা সুর বাঁধার মতো সৃষ্টিশীল কাজগুলো এত দিন কেবলই মানবীয় অনুভূতির প্রকাশ বলে বিবেচিত হলেও জেনারেটিভ অডিও এআইয়ের সাম্প্রতিক বিপ্লব সেই ধারণাকে বড় ধাক্কা দিচ্ছে। অন্যদিকে এআই প্রযুক্তির চরম ঝুঁকি নিয়ে বিল গেটস সতর্ক করে বলেছিলেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ১০০ কোটি মানুষের প্রাণহানি পর্যন্ত হতে পারে। অ্যালগরিদমের নিরপেক্ষতা এবং ভুল থেকে শিখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ঘটার নানা আলোচনার মধ্যেই প্রযুক্তিটি এখন সংগীতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।
বর্তমানে সুনো কিংবা উদোর মতো আধুনিক সেবাগুলো সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে তাক লাগানো অগ্রগতি দেখিয়েছে। ল্যাপটপে শুধু নির্দেশ লিখে দেওয়া হলো—বৃষ্টির বিষণ্নতা জড়িয়ে অ্যাকোস্টিক গিটার ও বাঁশির সুরে একটি মেলোডিয়াস বাংলা গান চাই। মাত্র দুই থেকে তিন মিনিটের ব্যবধানে এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ গান উপহার দিচ্ছে। সেখানে যন্ত্রসংগীতের পাশাপাশি থাকছে আকর্ষণীয় গানের কথা, তাল এবং কাল্পনিক গায়কের নিখুঁত গায়কী, যেখানে মানুষের মতো স্বাভাবিক শ্বাস নেওয়া ও গলার কম্পনও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
যন্ত্রের মাধ্যমে এই সুরের ছোঁয়া ফুটিয়ে তোলার মূল ভিত্তি গণিত এবং সুরের প্যাটার্ন চেনার পারদর্শিতা। কোনো ধরনের কাগজ-কলম ছাড়াই নিউরাল নেটওয়ার্ককে বিশ্বের কোটি কোটি গান শুনিয়ে দক্ষ করে তোলা হয়েছে। এর মাধ্যমে এআই বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করে কোনো সুরের পর কোন নোটটি মানুষের শুনতে ভালো লাগবে, বেদনার গানে ড্রামসের লয় কেমন হবে কিংবা আনন্দের মুহূর্তে কর্ডের বদল কীভাবে ঘটবে।
মুহূর্তের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গান তৈরির এই ক্ষমতায় বিশ্বজুড়ে শীর্ষ সুরকার ও বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলছে যে মানুষের দীর্ঘ সংগীতসাধনার প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়ে যাবে কি না। তবে এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ সূত্রে প্রাপ্ত বিশ্লেষণ বলছে, এআই কোটি কোটি সুরের বিন্যাস মেলাতে পারলেও তার নিজস্ব কোনো অভিজ্ঞতা থাকে না। ভালোবাসা, বিচ্ছেদ বা সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে গান লেখার পেছনে মানুষের জীবনের যে বাস্তবিক অনুভূতি কাজ করে, অ্যালগরিদম কেবল তার বাহ্যিক রূপই নকল করতে পারে, অভ্যন্তরীণ অনুভূতির রূপ দিতে পারে না।
ফলে তরুণ সুরকারদের অনেকেই এআইকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করছেন। সুরের কোনো প্রাথমিক ধারণা এলে তাঁরা এআইয়ের মাধ্যমে দ্রুত একটি খসড়া বা ডেমো তৈরি করে নিচ্ছেন এবং পরবর্তী সময়ে নিজস্ব মেধা ও আবেগ দিয়ে সেটিকে সমৃদ্ধ করছেন। জটিল গবেষণাগার ছাড়িয়ে প্রযুক্তি এখন শিল্পচর্চায় ঢুকে পড়েছে; যন্ত্র গতি এনে দিতে পারলেও সৃষ্টিতে প্রাণ দেওয়ার আসল শক্তি মানুষের কাছেই রয়ে গেছে। হাজারটা সুরের ভিড়ে কোন সুরটি হৃদয় ছুঁয়ে যাবে, সেই সক্ষমতা সর্বদাই মানবজাতির অধিকারে থাকবে।