মাগুরা পৌর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে রয়েল পরিবহনের টিকিট কাউন্টারে প্রাণ হারানো যুবদল নেতা শাকের হোসেনের (৩৯) মাথার খুলির ভেতর থেকে একটি বুলেট উদ্ধার করা হয়েছে। আজ বুধবার দুপুরে মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে চিকিৎসক ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়। চিকিৎসকদের প্রাথমিক অভিমত, বুলেটের আঘাতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থান্দার খায়রুল হাসান জানান, মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন যে মাথার খুলির ভেতরে একটি বুলেট পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে গুলির আঘাতেই মৃত্যু হয়েছে, তবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট হবে। নিহত শাকের মাগুরা পৌর যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন এবং পারনান্দুয়ালী ব্যাপারীপাড়ার প্রয়াত কুতুবউদ্দিনের ছেলে। তিনি কাউন্টার মাস্টারের দায়িত্বে ছিলেন। আজ ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে টার্মিনালে তাঁকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পেয়ে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। প্রথমে অসুস্থতাজনিত মৃত্যু ভেবে স্বজনেরা মরদেহ বাড়ি নিয়ে যান, তবে গোসলের প্রস্তুতির সময় মাথার পেছনে জখম দেখে পুলিশে খবর দেন। এরপর মরদেহটি ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, বাস টার্মিনালের প্রবেশদ্বারে থাকা জেলা পুলিশের নজরদারি ক্যামেরার অডিওতে ঘটনার সময় দুটি গুলির আওয়াজ ধরা পড়েছে। ওই সময়ে বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল ও ইজিবাইককে টার্মিনালে যাতায়াত করতে দেখা গেলেও কাউন্টারটি ক্যামেরার দৃষ্টিসীমার বাইরে থাকায় মূল দৃশ্যটি ধরা পড়েনি। তবে ওই মুহূর্তে কাউন্টারে বাসের অপেক্ষায় থাকা ঢাকার দুজন যাত্রী উপস্থিত ছিলেন, পুলিশ তাঁদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, একটি মোটরবাইকে আসা দুই দুর্বৃত্ত শাকেরকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পালিয়ে গেছে। যদিও হামলাকারীদের পরিচয়, ব্যবহৃত অস্ত্র কিংবা অপরাধের কারণ এখনও উদঘাটন করা যায়নি।
ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, চিকিৎসকেরা ময়নাতদন্ত শেষে মাথার ভেতর বুলেট পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সকাল থেকেই প্রত্যক্ষদর্শীরা গুলির কথা বলছিলেন এবং এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা ‘টার্গেট কিলিং’ মনে করা হচ্ছিল, যা বুলেট পাওয়ায় নিশ্চিত হলো। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এ ঘটনায় বড় কোনো চক্র থাকতে পারে। অবিলম্বে নেপথ্যের কারণ ও দোষীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সহিংসতার সময় ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি। এ ছাড়া দুপুরে মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। সকাল থেকেই বিএনপির নেতা-কর্মীদের ভিড় দেখা যায় এবং দুপুর ১২টার দিকে টার্মিনাল চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল করে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক কিছু সময় অবরোধ করে রাখা হয়।
এদিকে পারনান্দুয়ালী ব্যাপারীপাড়ায় নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্বজনদের কান্না। পঞ্চম শ্রেণি ও নার্সারিতে পড়ুয়া দুই সন্তানের জননী স্ত্রী শারমিন আক্তার রুমা কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, শাকের প্রতিদিনের মতোই ভোরে কাউন্টারে গিয়েছিলেন। কারও সঙ্গে তাঁর কোনো শত্রুতা বা হিংসা ছিল না এবং তিনি সবার সঙ্গে মিলেমিশে চলতেন। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘কে আমার স্বামীকে নিয়ে গেল, আপনারা বের করে দেন। যে এই কাজ করেছে, তাকে খুঁজে বের করে আমার সামনে আনুন।’ শাকেরকে হারিয়ে সন্তানদের লালন-পালন ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।