ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাইতে মিশিগান ও ওহাইও চষে বেড়াচ্ছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। নির্বাচনি সভাগুলোতে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করছেন, যদিও নিজের শাসনকালে তিনিও প্রায় একই ধারার নীতি অনুসরণ করেছিলেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হার্ভার্ড ইয়ুথ পোলের তথ্যানুযায়ী, কংগ্রেসে ডেমোক্রেটিক পার্টির কার্যক্রমে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিবন্ধিত তরুণ ভোটারদের দুই-তৃতীয়াংশ। পাশাপাশি দলটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ তরুণ সমর্থক ইসরায়েলকে ওয়াশিংটনের সামরিক সহায়তা প্রদান বন্ধের পক্ষে মত দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাট ও প্রগতিশীল শিবির প্রচারের মূল মুখ হিসেবে ওবামাকেই ব্যবহার করছে, যার শাসনামল বহু বিতর্কিত সিদ্ধান্তে পূর্ণ ছিল।
ওবামার সময়ে ৩০ লক্ষাধিক অভিবাসীকে আমেরিকা থেকে বিতাড়ন করায় তাকে ‘ডিপোর্টার-ইন-চিফ’ আখ্যা দেওয়া হয়। সে সময় হাজার হাজার আশ্রয়প্রার্থী নারী ও শিশুকে আটকে রাখা হয়েছিল। ২০১৪ সালে অভিবাসী পরিবারগুলোকে দলবদ্ধভাবে আটকে রাখার বিধান পুনরায় কার্যকর করা হয় এবং এর পরের বছরই এ ধরনের বন্দিশিবিরের ধারণক্ষমতা ১০০ শয্যার নিচ থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৩ হাজার ৭০০-তে উন্নীত করা হয়। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে গৃহীত এই পদক্ষেপটি পরবর্তীতে একটি ফেডারেল আদালতের নির্দেশে বাতিল হয়ে যায়। সাবেক এই রাষ্ট্রপ্রধান অতীতে ট্রাম্পকে ‘বিশৃঙ্খলা, নিষ্ঠুরতা, দুর্নীতি ও অযোগ্যতার’ প্রতীক হিসেবে আখ্যা দিলেও ইতিহাস তার নিজের নির্মমতার কথাও মনে করিয়ে দেয়। দায়িত্ব নেওয়ার আগে অতীতের দিকে না তাকিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর যুক্তিতে বুশ প্রশাসনের নির্যাতনকারী কর্মকর্তাদের বিচারের উদ্যোগ নেননি ওবামা। বর্তমান ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বও তরুণদের প্রত্যাশিত পরিবর্তনের বদলে পুরোনো নেতাদের মাধ্যমে অতীতের নীতিগুলোকেই টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট।
ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির নিন্দা জানাচ্ছেন ওবামা, যে সংঘাতে ২১ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। অথচ ওবামার দুই মেয়াদে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে ১ লাখেরও বেশি ইরাকি ও আফগান নাগরিকের পাশাপাশি ২ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনার মৃত্যু হয়েছিল। তৎকালীন প্রেসিডেন্টের টেবিলে নিয়মিত প্রতি সপ্তাহে প্রাণঘাতী হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকা থাকত। ২০১১ সালে ইয়েমেনে ওবামার অনুমোদিত ড্রোন হামলায় প্রাণ হারায় ১৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক আবদুর রহমান আল-আওলাকি। এছাড়া আফগানিস্তানের কুন্দুজে অবস্থিত হাসপাতাল, পাকিস্তান ও ইয়েমেনের বিভিন্ন বিয়ের আসর ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় পরিচালিত হামলায় বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হন। এমনকি ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি জোটের সামরিক অভিযানেও রসদ সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও বিমানে জ্বালানি দেওয়ার মাধ্যমে সহায়তা করেছিল ওবামা প্রশাসন।
২০০৯ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী ওবামার কার্যকাল ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে যুদ্ধ পরিচালনা, হন্ডুরাসে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারকে হটাতে মদদ দেওয়া, আরব বিশ্বের স্বৈরাচারীদের সমর্থন এবং ইরানে হামলার হুমকির মতো ঘটনায় প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ইসরায়েলের প্রতিও ছিল তার নিরঙ্কুশ আনুকূল্য। দখলদার বাহিনীর হাতে নিহত হাজারো আরব বেসামরিক মানুষের প্রতি সমবেদনা না জানিয়ে তিনি উল্টো ফিলিস্তিনিদের তরফ থেকে ইসরায়েলকে মেনে না নেওয়ার সমালোচনা করেছিলেন। ইউরোপে খ্রিস্টানদের দ্বারা ইহুদিদের ওপর সংঘটিত হলোকাস্টের ইতিহাস স্মরণ করতে আরবদের আহ্বান জানালেও ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা নাকবা এবং অব্যাহত বাস্তুচ্যুতির বাস্তবতাকে তিনি এড়িয়ে গেছেন।
মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী আবদুল রহমান ‘আবদুল’ এল-সাইয়েদ করপোরেট সমাজতন্ত্র ও গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার প্রকাশ্য বিরোধী হলেও মঞ্চে তাকে ওবামার পাশেই দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে। একইভাবে ২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন এবং ২০২০ সালে জো বাইডেনকে ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে উপস্থাপন করে ভোটারদের সমর্থন টানার চেষ্টা চলেছিল। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক আরব রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের অধ্যাপক জোসেফ মাসাদ মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত নিবন্ধে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।