advertisement
advertisement

মৃত্যু ও দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি পেরিয়ে অমিতাভ বচ্চনের ৮৪তম জন্মদিন: ঘুরে দাঁড়ানোর অনন্য ইতিহাস


আলজাজিরা নিউজ বিডি -"রক্ত চক্ষুর চাহনি? সে তো ক্ষণিকের ধোঁয়া,সত্যের শিখা জ্বলে ওঠে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ" | প্রতিবেদক: Md. Zahangir Hasan প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ৯:৩০ পূর্বাহ্ণ
মৃত্যু ও দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি পেরিয়ে অমিতাভ বচ্চনের ৮৪তম জন্মদিন: ঘুরে দাঁড়ানোর অনন্য ইতিহাস

অমিতাভ বচ্চন। এক্স থেকে

advertisement

জীবনের নানা চড়াই-উতরাই, প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা, বিশাল দেনা এবং রাজনৈতিক বিতর্কের মতো কঠিন পরিস্থিতি জয় করে বারবার স্বমহিমায় ফিরে এসেছেন অমিতাভ বচ্চন। আজ ১১ অক্টোবর ৮৪ বছরে পা দিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি অভিনেতা। ১৯৪২ সালের এই দিনে উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে (বর্তমান প্রয়াগরাজ) প্রখ্যাত কবি হরিবংশ রাই বচ্চন ও তেজি বচ্চনের ঘরে তাঁর জন্ম। শুরুতে পিতা তাঁর নাম ‘ইনকিলাব’ রাখতে চেয়েছিলেন, তবে কবি সুমিত্রানন্দন পন্তের পরামর্শে নামকরণ করা হয় অমিতাভ। প্রাথমিক জীবনে তাঁর দীর্ঘ শারীরিক গঠন ও গম্ভীর কণ্ঠস্বর নিয়ে সংশয় থাকলেও পরবর্তীতে এই বৈশিষ্ট্যগুলোই ভারতীয় মধ্যবিত্তের ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ভাষ্য হয়ে ওঠে।

১৯৬৯ সালে ‘সাত হিন্দুস্তানি’ দিয়ে অমিতাভের রূপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে। এরপর ১৯৭৩ সালের ‘জঞ্জির’ তাঁর ভাগ্য বদলে দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ ভাবমূর্তি। পরবর্তী সময়ে ‘দিওয়ার’, ‘শোলে’, ‘ত্রিশূল’ ও ‘কালা পাথর’-এর মতো চলচ্চিত্রে তিনি প্রতিবাদী তরুণের ভূমিকায় জনপ্রিয়তা পান। ক্যারিয়ারে কুড়িরও বেশি সিনেমায় তাঁর চরিত্রের নাম ছিল ‘বিজয়’। এছাড়া ‘ডন’, ‘কসমে ওয়াদে’, ‘দ্য গ্রেট গ্যাম্বলার’, ‘সত্তে পে সত্তা’ ও ‘সূর্যবংশম’-এ দ্বৈত ভূমিকায় এবং ‘মহান’ চলচ্চিত্রে তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। পাশাপাশি নেপথ্য কণ্ঠ দেওয়া ছাড়াও ‘লাওয়ারিস’, ‘সিলসিলা’ ও ‘তুফান’ ছবিতে গান গেয়েছেন এবং রেখার সঙ্গে জুটি বেঁধে ‘মুকাদ্দর কা সিকান্দার’, ‘মিস্টার নটওরলাল’, ‘সিলসিলা’ ও ‘সুহাগ’-এর মতো সফল ছবি উপহার দেন।

সত্তরের শুরুতে সুপারস্টার রাজেশ খান্নার সঙ্গে ‘আনন্দ’ (১৯৭১) ও ‘নমক হারাম’ (১৯৭৩) ছবিতে তাঁর কাজ প্রশংসিত হয়। তবে সময়ের পরিবর্তনে রোমান্টিক ঘরানার পরিবর্তে ক্ষুব্ধ যুবকের চরিত্র দর্শকের প্রিয় হয়ে উঠলে অমিতাভের প্রভাব বাড়ে। দুই তারকার সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও ১৯৯০ সালে হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত যৌথ সাক্ষাৎকারে তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ফুটে ওঠে। রাজেশ খান্না প্রসঙ্গে অমিতাভ মন্তব্য করেছিলেন, “আমার কাছে রাজেশ খান্নাই প্রকৃত অর্থে একমাত্র সুপারস্টার। তাঁর সাফল্য ও কঠোর পরিশ্রম ছিল অসাধারণ। তাঁর অর্জনের তুলনায় আমার অর্জন কিছুই নয়। ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ ঘরানায় সাফল্য পাওয়ার পর আমাকে সেই ধরনের চরিত্রেই আটকে থাকতে হয়েছিল। অন্য কিছু করার চেষ্টা করলে অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু খান্না এসব নিয়ে ভাবতেন না। ১৯৬৫ সালে তাঁর কথা প্রথম শোনার পর থেকেই তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা। একসঙ্গে কাজ করার পর সেই শ্রদ্ধা আরও বেড়েছে। আজও তাঁকে আমার চেয়ে বড় অভিনেতা মনে করি।” এছাড়া বার্ধক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, “আমাদের সবাইকে মেনে নিতে হবে যে বয়স বাড়বেই। আর বয়স বাড়াটা সব সময় যে চেহারার জন্য সুখকর হবে, তা নয়।”

১৯৮২ সালের ২৬ জুলাই বেঙ্গালুরুতে মনমোহন দেশাইয়ের ‘কুলি’ ছবির শুটিংয়ে সহ-অভিনেতা পুনীত ইসারের সঙ্গে মারপিটের দৃশ্যে অভিনয়কালে পেটে মারাত্মক আঘাত পান অমিতাভ। অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে একাধিক অস্ত্রোপচারের পর মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন তিনি। তৎকালীন সংকট নিয়ে ইন্ডিয়া টুডে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এই দুর্ঘটনার কারণে ছবির পূর্বপরিকল্পিত সমাপ্তি বদলে দিয়ে তাঁর চরিত্রকে জীবিত রাখা হয় এবং ১৯৮৩ সালে মুক্তির পর ‘কুলি’ সুপারহিট হয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে ঋষি কাপুর স্মরণ করেন, সুস্থ হয়ে অমিতাভ সেই দৃশ্য থেকেই শুটিং শুরু করেছিলেন যেখানে তিনি আহত হন। ভবিষ্যৎ নিয়ে অমিতাভের পর্যবেক্ষণ ছিল, “ক্যারিয়ারের কোনো পর্যায়েই আমি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম না।” পরবর্তীতে ২০১৭ সালের হেপাটাইটিস-বি সচেতনতা কার্যক্রমে তিনি জানান, ১৯৮২ সালের সেই চিকিৎসায় রক্ত গ্রহণের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমিত হয়ে ২০০০ সালের পরীক্ষায় তাঁর যকৃতের প্রায় ৭৫ শতাংশ অকেজো হওয়ার তথ্য ধরা পড়ে।

বন্ধু ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর অনুপ্রেরণায় ১৯৮৪ সালে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে এলাহাবাদ আসন থেকে কংগ্রেসের টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন অমিতাভ। তবে ১৯৮৭ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে বফর্স কামান কেলেঙ্কারিতে তাঁর নাম জড়ালেও সাবেক সুইডিশ পুলিশ কর্মকর্তা স্টেন লিন্ডস্ট্রম জানিয়েছিলেন, অমিতাভকে জড়ানোর পেছনে ভারতীয় তদন্তকারীদের হাত ছিল। সিবিআইয়ের পক্ষ থেকেও জানানো হয়, কোনো নিয়মিত মামলা বা চার্জশিটে তিনি অভিযুক্ত ছিলেন না। নিজের অপূর্ণতা নিয়ে অমিতাভ একবার বলেছিলেন, “ইশ্‌, যদি আমাদের দেশের সব ভাষা শেখার সময় পেতাম! ইশ্‌, যদি কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শিখতে পারতাম! এমন অনেক কিছু আছে, যা শেখা হয়নি বলে আমার আফসোস হয়।”

নব্বইয়ের দশকে বিনোদন ব্যবসাকে করপোরেট রূপ দিতে অমিতাভ বচ্চন করপোরেশন লিমিটেড (এবিসিএল) গঠন করে বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়েন তিনি। সঞ্চিত লোকসান ৭০ কোটি রুপি ছাড়িয়ে গেলে প্রতিষ্ঠানটি রুগ্‌ণ ঘোষিত হয়। ২০১৩ সালে ইন্ডিয়া টুডেকে অমিতাভ জানান, সে সময় পাওনাদাররা তাঁর বাড়ি এসে হুমকি ও অপমান করত। এই দুরবস্থা থেকে বাঁচতে তিনি যশ চোপড়ার কাছে কাজ চান এবং ছেলে আদিত্য চোপড়ার ‘মোহাব্বতে’ (২০০০) সিনেমার মাধ্যমে নতুন গতি পান। নিজের জীবনসংগ্রাম নিয়ে তাঁর উক্তি ছিল, “জীবনে কত কিছুর মধ্য দিয়ে গিয়েছি, আর আমার শরীর যেভাবে সেসবের সঙ্গে লড়াই করেছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। হয়তো এ কারণেই আমি ধর্মের প্রতি বেশি বিশ্বাসী হয়ে উঠেছি। কারণ, কখনো বুঝতে পারি না কেন কোনো ঘটনা আমার জীবনে ঘটছে, আবার কীভাবে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছি, সেটাও বুঝতে পারি না।”

২০০০ সালে স্ত্রী জয়া বচ্চনের প্রাথমিক সংশয় সত্ত্বেও অমিতাভ ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’র উপস্থাপক হিসেবে ছোট পর্দায় পদার্পণ করেন, যা তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে। ব্লগে তিনি লিখেছিলেন, ২০০০ সালে কাজহীন, অর্থহীন এবং আইনি ঝামেলায় জর্জরিত থাকা অবস্থায় এই শো তাঁর জীবন বদলে দেয়; ২০০৫ সালে টাইম সাময়িকীও এই পুনরুত্থানকে তুলে ধরে। পরবর্তীতে ‘বাগবান’ (২০০৩), ‘ব্ল্যাক’ (২০০৫), ‘সরকার’ (২০০৫), ‘চিনি কম’ (২০০৭), ‘পা’ (২০০৯) ও ‘পিকু’ (২০১৫) চলচ্চিত্রে ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। ‘ব্ল্যাক’-এর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয়ের পাশাপাশি ‘পা’ ও ‘পিকু’ দিয়ে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছান এই বর্ষীয়ান তারকা।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর