রিভার্স সুইংয়ের হার বাড়ার পর শেষ দিকে রান তোলায় হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ
ওয়ানডে ক্রিকেটে বলের সুইং বাড়লেও কমছে না রানের খরচ; উল্টো ওভারপ্রতি রান বিলানোর হার ও বোলিং গড় ঊর্ধ্বমুখী। একই সঙ্গে ব্যাটসম্যানদের দুর্দশাও স্পষ্ট, ইনিংসের অন্তিমলগ্নে কমে যাচ্ছে দ্রুত রান তোলার গতি। একই নিয়মের সুবিধা কাজে লাগিয়ে অন্যান্য দল যখন সাফল্য পাচ্ছে, বাংলাদেশ তখন ব্যাটিং ও বোলিং—উভয় বিভাগেই নতুন নিয়মের ধাঁধায় নাকাল হচ্ছে। বোলাররা বাড়তি সুইং পেলেও তা উইকেট বা রান আটকানোর অস্ত্র বানাতে পারছেন না, আর ব্যাটসম্যানরা প্রতিপক্ষের রিভার্স সুইং সামলাতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছেন। এর সাম্প্রতিক প্রমাণ মিলেছে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজের ম্যাচে, যেখানে জিম্বাবুয়ের ৮ উইকেটে তোলা ২৭১ রানের জবাবে বাংলাদেশ ৩৪ ওভারে মাত্র ১৭২ রানে গুটিয়ে গিয়ে ৯৯ রানে পরাজিত হয়। ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তাসকিন আহমেদ জানান, বোলিংয়ে কিছুটা ধারাবাহিকতা এলেও নিয়মিত ব্যাটিং ব্যর্থতাই পরাজয়ের কারণ।
সেই ম্যাচে তাসকিন ১০ ওভারে ৪৪ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়ে দলের সেরা বোলার ছিলেন। তবে ইনিংসে তাঁর ছন্দপতন স্পষ্ট ছিল। নতুন বলে প্রথম স্পেলে ৬ ওভারে ২ মেডেনসহ ১৮ রানে ৩ উইকেট নিলেও, ডেথ ওভারের ২ ওভারে তিনি ১৯ রান (একটিতে ১০, অন্যটিতে ৯) দিয়ে কোনো উইকেট পাননি। কাটার মাস্টারখ্যাত মোস্তাফিজুর রহমানও ডেথের ৩ ওভারে উইকেটশূন্য থেকে দেন ২৪ রান। এই পরিস্থিতির কারণ লুকিয়ে রয়েছে গত বছরের জুলাইয়ে ওয়ানডেতে আইসিসির আনা বলের বিধানে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ইনিংসের প্রথম ৩৪ ওভার দুই প্রান্ত থেকে দুটি পৃথক বল ব্যবহারের পর অধিনায়ক যেকোনো একটি বল বেছে নেন, যা দিয়ে বাকি ১৬ ওভার খেলা হয়। অধিনায়কেরা সাধারণত রিভার্স সুইংয়ের সুবিধার জন্য অপেক্ষাকৃত পুরোনো ও খসখসে বলটি বেছে নিচ্ছেন। ক্রিকেট পরিসংখ্যান সংস্থা ক্রিকভিজের মতে, এতে রিভার্স সুইং নতুন মাত্রা পেয়েছে। অন্য দলগুলো এর সাথে মানিয়ে নিলেও বাংলাদেশ ব্যাটিং ও বোলিং উভয় ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, নতুন নিয়ম কার্যকরের পর ডেথ ওভারে (ন্যূনতম ৬ ওভার বল করা পেসারদের মধ্যে) সুইং বৃদ্ধির দিক দিয়ে শীর্ষ চারে রয়েছেন বাংলাদেশের মোস্তাফিজ ও তাসকিন। মোস্তাফিজের সুইং বেড়েছে ৪৯.৫ শতাংশ, কিন্তু ডেথ ওভারে তাঁর বোলিং গড় কমে যাওয়ার বদলে বেড়েছে ৫.৩ এবং ইকোনমি বেড়েছে ০.৯। তাসকিনের সুইং ৪০.৮ শতাংশ বাড়লেও বোলিং গড় ১.৯ ও ইকোনমি ১.৬ বেড়েছে। বিপরীতে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের আলজারি জোসেফের সুইং ৮৩.৬ শতাংশ বেড়ে গড় কমেছে ৬.৭ (ইকোনমি অপরিবর্তিত) এবং দক্ষিণ আফ্রিকার লুঙ্গি এনগিডির সুইং ৬৩.৩ শতাংশ বৃদ্ধির সঙ্গে গড় কমেছে ১০.৬ ও ইকোনমি ৩.৩ কমেছে। এমনকি পাকিস্তানের নাসিম শাহ মাত্র ৩৮ শতাংশ সুইং বাড়িয়েও গড় ১৯.২ ও ইকোনমি ১.৬ কমিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার নাথান এলিসের সুইং ৩৯.৯ শতাংশ হ্রাস পাওয়া সত্ত্বেও গড় কমেছে ৬১ (ইকোনমি অপরিবর্তিত)। অর্থাৎ সুইংকে রান নিয়ন্ত্রণ ও উইকেটে রূপান্তরের দক্ষতায় পিছিয়ে রয়েছেন বাংলাদেশি পেসাররা।
বোলিংয়ের চেয়েও বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ব্যাটিংয়ে। ডেথ ওভারের শেষ ১০ ওভারে সাধারণত দ্রুত রান তোলার পরিকল্পনা থাকলেও রিভার্স সুইংয়ের কারণে তা দুরূহ হয়ে পড়েছে। নিয়ম পরিবর্তনের আগে বাংলাদেশ শেষ ১০ ওভারে ওভারপ্রতি ৭.৮৪ রান (গড়ে প্রায় ৭৮) তুলত, যা এখন নেমে এসেছে ৬.৫৬-তে (গড়ে প্রায় ৬৬)। ওভারপ্রতি রান কমেছে ১.২৮। ডেথ ওভারে রানরেট কমার তালিকায় বাংলাদেশ চতুর্থ; যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২.৩৯ (১০.৩১ থেকে ৭.৯২), নিউজিল্যান্ডের ১.৬৮ এবং অস্ট্রেলিয়ার ১.৪৭ কমেছে। বিপরীতে ভারত ওভারপ্রতি ১.৩৪ বাড়িয়ে রানরেট ৬.৯৯ থেকে ৮.৩৩ এবং ইংল্যান্ড ৮.০৭ থেকে ৯.১৬-তে উন্নীত করেছে।
এই সমীকরণ সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে। আগামী বছরের অক্টোবর-নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায় বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে। দক্ষিণ আফ্রিকার বাউন্সি উইকেটে শেষ দিকে এমনিতেই বল সুইং ও মুভ করে। যদিও জুলাই ২০২৫-এ নিয়ম কার্যকরের পর দেশটিতে মাত্র তিনটি ওয়ানডে হয়েছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে ডেথ ওভারে ওভারপ্রতি গড় রান উঠেছে ৭.৩৫। তবে রিভার্স সুইং কার্যকর হলে ডেথ ওভারে রান তোলা কঠিন হবে। সে ক্ষেত্রে ইনিংসের ২০ থেকে ৪০ ওভারের মধ্যেই রান তোলার গতি বাড়ানোর কৌশল রপ্ত করতে হবে। হাতে থাকা এক বছর সময়ের মধ্যে একদিকে মোস্তাফিজ-তাসকিনদের বাড়তি সুইং নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে, অন্যদিকে ব্যাটসম্যানদেরও রিভার্স সুইং সামলানোর উপায় খুঁজে বের করতে হবে।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।