প্রতাপ শঙ্কর হাজরা
‘আমার জীবনের প্রত্যেকটা কষ্টের সময়েই আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল মোহামেডান। আর এই মোহামেডানই আবার যখন চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, একেক বছরের পর বছর, তখন আনন্দও দিছে আবার সাংঘাতিক’—এভাবেই ক্লাবের প্রতি নিজের গভীর অনুভূতির কথা জানান মোহামেডানের প্রতাপ শঙ্কর হাজরা। ১৯৬৩ সালে এই ক্লাবে যুক্ত হওয়ার পর আর কখনো এর মায়া কাটাননি তিনি। তবে শুধু মোহামেডানের খেলোয়াড় হিসেবেই নয়, দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ফুটবল, হকি ও ক্রিকেট—তিন বিভাগেই বিচরণ করা এক অনন্য ব্যক্তিত্ব তিনি। পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তান দলের হয়ে ফুটবল ও হকি খেলেছেন, আর স্বাধীনতার সময় ঐতিহাসিক স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সংগঠক ও সহ-অধিনায়ক হিসেবে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। পরবর্তীতে তিনি জাতীয় হকি দলের কোচের দায়িত্বও সামলেছেন। ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি তুলে ধরেন তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনগাথা, যা একই সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রীড়াজগতেরও এক জীবন্ত ইতিহাস। সেই পথচলায় জড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার ক্লাব সংস্কৃতি, আরমানিটোলা স্কুলের মাঠ, পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলে সুযোগ পাওয়ার গৌরব, একাত্তরে বাড়ি পুড়ে যাওয়ার ক্ষত এবং শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের মাটিতে থেকে যাওয়ার অবিচল অঙ্গীকার।
১৯৪২ সালের ৩ এপ্রিল (বাংলা ১৩ চৈত্র ১৩৫০) জন্ম নেওয়া প্রতাপ শঙ্করের শৈশব কেটেছে পঞ্চাশের মন্বন্তর ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উত্তাল সময়ে, যা তিনি জেনেছেন পরিবার ও স্মৃতিচারণা থেকে। তাঁদের আদি নিবাস ছিল ফরিদপুরের শিবচরে, যা নদীভাঙনে হারিয়ে যাওয়ার পর পরিবারটি বসতি গড়ে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের দোগাছিতে। তাঁর বাবা প্রিয় শঙ্কর হাজরা ছিলেন ঢাকা বারের প্রখ্যাত আইনজীবী, যিনি ঠাকুরমার ইচ্ছায় শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনে পড়েন। আর মা অন্নপূর্ণা হাজরা বেনারসে লেখাপড়া করেছিলেন। ১৯৫০ সালের দাঙ্গার সময় কলকাতা, কাশী ও রাঁচিতে আশ্রিত থাকার পর পরিবারসহ ঢাকায় ফিরে ১৯৫২ সালে তিনি ভর্তি হন আরমানিটোলা গভর্নমেন্ট স্কুলে। প্রতিষ্ঠানটি প্রসঙ্গে তিনি জানান, আটের দশক পর্যন্ত স্কুলটি কখনো রানার্সআপ হয়নি, প্রতিবারই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ছোটদের পৃথক মাঠ, বয়সভিত্তিক দল এবং সারা বছর ফুটবল, হকি ও ক্রিকেট প্রতিযোগিতার চমৎকার আয়োজন ছিল সেখানে। বর্তমান সময়ের চিত্র নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমি যখন ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হয়েছি, তখন দাদাদের কাছেও শুনছি যে গেম টিচার আছে। এখন গেম টিচার নেই। তো খেলাধুলা শেখাবে কে? খেলাধুলা হবে কী করে?’
মাত্র ১৩ বছর বয়সে ওয়ারী ক্লাবের জার্সিতে প্রথম বিভাগ হকি খেলেন তিনি। এরপর ১৯৫৮ সালে প্রথম বিভাগ হকি এবং ১৯৬১ সালে ভিক্টোরিয়া ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ফুটবলে নাম লেখান। ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান হকি দল ও পরের বছর ফুটবল দলে সুযোগ পান। ক্রিকেটও খেলতেন দাপটের সঙ্গে, তবে ১৯৬৬ সালে ঢাকায় কমনওয়েলথ দলের টম গ্রেভনির ব্যাটিং দেখে ক্রিকেট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। গ্রেভনির নিখুঁত ব্যাটিং দেখে তাঁর উপলব্ধি হয়েছিল, ‘ও যে ছয় মারছে, মনেই হয় না যে ছয় মারছে! আমরা তো গায়ের জোর দিয়ে মারি, ও শুধু ব্যাটটা উঠিয়ে দিল, ছয় হয়ে গেল।’ সেই দৃশ্য দেখে তাঁর মনে হয়েছিল, ‘এই সব দেখে আমি ভাবলাম যে গ্রেভনি ক্রিকেট খেলে, আমরা ক্রিকেটকে রেপ করি।’ যদিও ১৯৭৩ সালে খেলোয়াড় সংকটের মুখে শান্তিনগরের হয়ে কিছুদিনের জন্য তাঁকে আবারও ক্রিকেটে দেখা গিয়েছিল। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের স্ট্যান্ডবাই থাকার পর ১৯৬৫ সালে পেশোয়ারের ট্রায়াল পেরিয়ে জহির ভাই ও তিনি—এই দুই বাঙালি মূল দলে জায়গা পান এবং শ্রীলঙ্কা সফরে যান। ফিরে আসার পর মায়ের স্নেহের আলিঙ্গন স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘সেটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দ যে দেশের যে কাজই আমি করি, সেই কাজের টপ লেভেলে পৌঁছাতে পেরেছিলাম।’
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের আরমানিটোলার বাসভবন পুড়িয়ে দিলে মুসলিম প্রতিবেশীসহ মোট ২৪ জন দেয়াল টপকে সুরক্ষিতভাবে আশ্রয় নেন আর্মেনিয়ান চার্চে। পরবর্তী সময়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সংগঠক ও সহ-অধিনায়ক হন। নওগাঁয় দলের অধিনায়ক নির্ধারণী সভায় তিনি পিন্টু ভাই ও ননী বসাকের সঙ্গে সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে প্রথম প্রীতি ম্যাচে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে জাকারিয়া পিন্টু ও প্রতাপ শঙ্কররা মাঠ প্রদক্ষিণ করেছিলেন। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালে পাতিয়ালায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ১৯৮৬ সালে হকি দলের কোচের দায়িত্ব সামলান। বর্তমান সময়ে হকির পিছিয়ে পড়ার নেপথ্যে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি জানান, ফুটবল বা ক্রিকেটের চেয়ে হকি ব্যয়বহুল, কারণ এতে ২২ জন খেলোয়াড়েরই আলাদা স্টিক প্রয়োজন হয়। খেলার মাঠ ও শিক্ষকের অভাব তুলে ধরে তরুণ প্রজন্ম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ছোট বয়সে খেলাধুলায় জড়ালেই ড্রাগসও খাবে না, গুন্ডামিতেও যাবে না। প্লেয়ারদের নিজস্ব একটা স্বকীয়তা কিন্তু থাকে। নিজের ভেতর কিন্তু একটা ফিলিং থাকে, “আই অ্যাম আ স্পোর্টসম্যান।”’ ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময় মায়ের অনুরোধ সত্ত্বেও দেশান্তরী না হয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘মাতৃভূমি ছেড়ে আমি যাব না, আমার এটা জন্মভূমি।’ দোগাছির ভগ্নপ্রায় পৈতৃক বাড়ির মায়া আর নিজের মা ও মাটির প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে তাঁর অকপট ঘোষণা, ‘আমি জন্ম মাকেও ছাড়ব না, জন্মভূমিও ছাড়ব না।’
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।