advertisement
advertisement

প্রশাসনিক শৃঙ্খলার সংকট ও মন্ত্রীদের ভূমিকা: প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ড জরুরি


আলজাজিরা নিউজ বিডি -"রক্ত চক্ষুর চাহনি? সে তো ক্ষণিকের ধোঁয়া,সত্যের শিখা জ্বলে ওঠে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ" | প্রতিবেদক: Md. Zahangir Hasan প্রকাশিত: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১:২৮ অপরাহ্ণ
প্রশাসনিক শৃঙ্খলার সংকট ও মন্ত্রীদের ভূমিকা: প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ড জরুরি

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে সদ্য পদত্যাগকারী ইশরাক হোসেন, এমপি

advertisement

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে ওয়াকিল ওরফে বগা নামের এক কিশোর গ্যাং নেতাকে আটক করতে গিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা (ওসি) বাধার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ উঠেছিল। যদিও সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন জানিয়েছিলেন যে সংশ্লিষ্ট অপরাধী নগর ভবনে উপস্থিত ছিলেন না, তবু শেষ পর্যন্ত ওই অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া ওসির ভাগ্যে জোটে শাস্তিমূলক বদলি। নিয়মমাফিক এজাহার বা নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ অপরাধী ধরবে এবং বিচার বিভাগ তাদের দোষ-ত্রুণি যাচাই করে রায় দেবে। কিন্তু রাজনীতিবিদরা নিজেরাই বিচারকের ভূমিকা নিলে বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। সুশাসন সংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে যুব প্রতিমন্ত্রীকে রাতে সচিবালয়ে পাহারা দিতে দেখা যায় প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে। অথচ মন্ত্রণালয়ের বিশাল কর্মীবাহিনী থাকতে মন্ত্রীকে কেন রাত জেগে পাহারা দিতে হবে, কিংবা ভবিষ্যতে পিএসসি চেয়ারম্যান বা শিক্ষামন্ত্রীকেও একইভাবে বিসিএস ও এইচএসসির প্রশ্ন রক্ষা করতে রাত জাগতে হবে কি না—সে প্রশ্ন এসেই যায়।

এ ধরনের বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপে সংকটের সুরাহা সম্ভব নয়; প্রয়োজন উপর থেকে নিচ পর্যন্ত চেইন অব কমান্ড এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা। গত ২০ অক্টোবর চট্টগ্রামে বিএনপির সাংগঠনিক সভায় প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, ‘সবাই যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে ৫০ ভাগ অপরাধ কমে যাবে।’ মূলত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও সঠিক ভূমিকা পালনে ব্যর্থতাই অনেক সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা আজ বহুলাংশে দর্শকের ভূমিকায় অথবা মাঠপর্যায়ে দিকভ্রান্ত। নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব মন্ত্রীদের, আর তা বাস্তবায়নের ভার প্রশাসনের। কিন্তু অপরাধী ধরতে গিয়ে পুলিশই যখন শাস্তি পায়, তখন মন্ত্রীদের পাহারা বসাতে হয় কিংবা অস্ত্র হাতে মাঠে নামতে হয়, যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ জনগণকে।

মাদকবিরোধী তৎপরতায় সদ্য পদত্যাগী প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে কেউ ‘বীরপুরুষ’ বা ‘দাবাং মন্ত্রী’ আখ্যা দিলেও অনেকে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। মূল সমস্যা হলো, তিনি নিজের মন্ত্রিত্বের প্রাতিষ্ঠানিক দায়ভার সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেননি। তাঁর পিতা সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন একাত্তরের প্রশিক্ষিত গেরিলা যোদ্ধা, পরবর্তীতে একাধিকবারের মন্ত্রী ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র। বহু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলেও খোকাকে কখনো অস্ত্র হাতে প্রকাশ্য মহড়া দিতে দেখা যায়নি। সত্তরের দশকের শুরুর দিকে গফুর বালুচকে সাথে নিয়ে গোপীবাগে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ফুটবল দল গঠন করেছিলেন তিনি, যা মারামারিমুক্ত সুস্থ ক্রীড়াচর্চার মাধ্যমে তরুণদের সঠিক পথে রেখেছিল। এর বিপরীতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দীর্ঘ সময় তালা ঝুলিয়ে রেখে নাগরিক সেবা বিঘ্নিত করার মতো কর্মকাণ্ডে জড়ান ইশরাক।

সর্বশেষ প্রকাশ্যে পিস্তল প্রদর্শনের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। তবে ইশরাকের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ও তা মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের অসহায়ত্বের চিত্রও উন্মোচিত হয়েছে। মাদকাসক্তির কারণে সমাজে সহিংসতা ও অপরাধপ্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য টেলিগ্রাফ-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সিফাত নামের এক মাদকাসক্ত বাংলাদেশি তরুণ জানান, ‘আমার ওপর ইয়াবার তাৎক্ষণিক প্রভাব ছিল মেজাজ হারিয়ে ফেলা। তুচ্ছ কারণে আমি অন্যদের ওপর চড়াও হতাম—কখনো হাত দিয়ে, আবার কখনো লাঠি দিয়ে আঘাত করতাম।’ এই সর্বগ্রাসী সংকট কোনো ব্যক্তির একক উদ্যোগে সমাধানযোগ্য নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, যৌথ প্রয়াস এবং শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কার্যকর চেইন অব কমান্ড। (লেখক: সালেহ উদ্দিন আহমদ, শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com; মতামত লেখকের নিজস্ব।)

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর