হুতি যোদ্ধা, সানা, ইয়েমেন
সৌদি আরবের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নতুন ধরনের তথ্যযুদ্ধে নেমেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। সৌদি নেতৃত্বের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। সম্প্রতি মার্কিন বিচার বিভাগ কর্তৃক উন্মোচিত নথির বরাত দিয়ে হুতিরা প্রচার চালাচ্ছে যে, সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা পবিত্র কাবার গিলাফ এপস্টিনের ব্যক্তিগত দ্বীপে পাঠিয়েছিলেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন পাচারের অভিযোগে কারাগারে থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের বন্দিশালায় মারা যান এপস্টিন; তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন।
সৌদি কর্তৃপক্ষকে নিশানা করে হুতি প্রেসিডেন্ট মাহদি আল-মাশাত বলেন, যারা এপস্টিনকে পবিত্র কাবার গিলাফ দিয়েছিল, তারাই প্রকৃতপক্ষে মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। যদিও এ অভিযোগের বিপরীতে সৌদি প্রশাসন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। এর আগে গত মাসে রিয়াদ দাবি করেছিল, হুতিরা মুসলমানদের উসকে দেওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কা নগরী লক্ষ্য করে ড্রোন আক্রমণ চালিয়েছে, যা হুতিরা সরাসরি অস্বীকার করে। আল-মাশাতের বক্তব্যটি হুতিদের প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি সামাজিক মাধ্যম এক্সে ২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি অনুসারী থাকা এক ইয়েমেনি কৌতুক অভিনেতা এ নিয়ে ভিডিও বানান এবং এক ঐতিহ্যবাহী সংগীতশিল্পী এ ঘটনা নিয়ে গান রচনা করেন। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ইয়েমেনি কৌতুক অভিনেতা মোস্তফা আল-মুমরও গান, মন্তব্যভিত্তিক ভিডিও ও নাটিকা তৈরি করেছেন।
হুতি শীর্ষ নেতৃত্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক ভাষণেও নিয়মিতভাবে এপস্টিনের নাম উঠে আসছে। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে পরিচালিত হামলার প্রশংসা করে চলতি মাসে দেওয়া বক্তব্যে এবং ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের বর্ষপূর্তিতে সেপ্টেম্বরের ভাষণেও এপস্টিনের প্রসঙ্গ টানেন হুতি নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি। গত ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘এপস্টিনের ফাইলগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। এগুলো এমন এক জায়নবাদী আঁতুড়ঘর উন্মোচন করে, যা নেতা ও অভিজাতদের গড়ে তোলে।’ ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা জানান, হুতিরা টেলিভিশন, রেডিও, ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যেখানে অনেকে বিনা পারিশ্রমিকেই কাজ করছেন। আল-বাশার মতে, এপস্টিনকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দুর্নীতির রূপক হিসেবে এবং ইহুদিরা বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করছে—এমন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে লন্ডনভিত্তিক গবেষক মোস্তফা আয়াদ মনে করেন, হুতিরা সৌদি আরবের সঙ্গে যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্র ও এপস্টিন শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করে প্রমাণ করতে চাইছে যে রিয়াদ কার্যত ওয়াশিংটনের একই শিবিরের অংশ।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি প্রশাসনকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলা শুরুর পর থেকে দেশটিতে চরম মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সংঘাত, অনাহার ও মহামারির কারণে দেশটিতে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এদিকে গত আগস্টে লড়াই তীব্র হওয়ার পর নতুন করে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চলতি সপ্তাহের পরিসংখ্যান অনুসারে, সাম্প্রতিক এই সংঘাতের ধারায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। এর সমান্তরালে গত কয়েক সপ্তাহ জুড়ে সৌদি আরবের বিমান চলাচল ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হুতিদের ক্রমাগত হামলায় অন্তত ২২ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।