advertisement
advertisement

সত্যের বিরোধিতায় যুগে যুগে সক্রিয় তিন শ্রেণির শত্রু: কোরআনের আলোকে পর্যালোচনা


আলজাজিরা নিউজ বিডি -"রক্ত চক্ষুর চাহনি? সে তো ক্ষণিকের ধোঁয়া,সত্যের শিখা জ্বলে ওঠে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ" | প্রতিবেদক: Md. Zahangir Hasan প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৫:২৩ অপরাহ্ণ
সত্যের বিরোধিতায় যুগে যুগে সক্রিয় তিন শ্রেণির শত্রু: কোরআনের আলোকে পর্যালোচনা

advertisement

পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “আর যখন তাদের বলা হয়, ‘অন্যান্য লোক যেভাবে ইমান এনেছে তোমরাও সেভাবে ইমান আনো’, তখন তারা বলে, ‘নির্বোধরা যেভাবে ইমান এনেছে আমরাও কি সেভাবে ইমান আনব?’ সাবধান, তারাই তো নির্বোধ, কিন্তু তারা জানে না।” মানব ইতিহাসের সূচনা থেকেই সত্য ও মিথ্যার সংঘাত এক চিরন্তন বাস্তবতা। যুগে যুগে কোনো সংস্কারক যখনই সমাজে ন্যায় ও সত্যের আহ্বান জানিয়েছেন, তখনই কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কী ও মাদানী জীবনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একত্ববাদের প্রচার নস্যাৎ করতে তৎকালীন সমাজে মূলত তিনটি পৃথক বিরোধী পক্ষের জন্ম হয়েছিল। এই তিন গোষ্ঠীর বৈরিতার ধরন, মনস্তত্ত্ব ও কৌশল ছিল একেবারেই ভিন্ন। সমকালের আধুনিক সমাজেও সত্যপন্থীদের এই তিন ধরনের বিরোধিতারই মোকাবিলা করতে হয়।

বিরোধিতাকারীদের প্রথম পক্ষটির নেতৃত্বে ছিল মক্কার প্রভাবশালী ও অভিজাত ব্যক্তিরা। তারা মহানবী (সা.) ও সাহাবিদের বিরুদ্ধে সরাসরি ও প্রকাশ্যে শত্রুতা ঘোষণা করেছিল। তবে এই শত্রুতায় একধরনের আভিজাত্যের পাশাপাশি কিছুটা যুক্তিবোধ ও শিষ্টাচারের প্রকাশও দেখা যেত। যার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত আবু জাহেলের ঘটনা। একবার রাসুলুল্লাহকে (সা.) কটু ভাষায় গালমন্দ করে আবু জাহেল। এ ঘটনার কথা জেনে নবীজির চাচা হযরত হামজা (রা.) ছুটে এসে নিজের ধনুক দিয়ে আবু জাহেলের মাথায় সজোরে আঘাত করেন, যাতে তার মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। তখন আবু জাহেলের বনু মাখজুম গোত্রের লোকজন হামজার ওপর আক্রমণ করতে উদ্যত হলে আবু জাহেল তাদের নিবৃত্ত করে বলে, “আবু উমারাহকে (হামজা) ছেড়ে দাও, কারণ, আমি তার ভাতিজাকে জঘন্য ভাষায় গালমন্দ করেছিলাম।” (ইবনে হিশাম, আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ, ১/২৯২, দারুল জিল, বৈরুত, ১৯৯০)।

এই শ্রেণির বিরোধীদের চিন্তার পরিমণ্ডল পুরোপুরি সংকীর্ণ ছিল না; যৌক্তিক বিষয়ের মুখোমুখি হলে তারা তা নিয়ে ভাবার মানসিকতা রাখত। যেমন কুরাইশ নেতা উতবা ইবনু রাবিয়াহ একবার বিপুল ধনসম্পদ ও ক্ষমতার প্রলোভন দেখিয়ে নবীজির (সা.) সামনে সমঝোতার প্রস্তাব পেশ করে। কিন্তু আল্লাহর রাসুল (সা.) তার জবাবে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করে শোনালে সে স্তম্ভিত হয়ে যায়। নিজ গোত্রের কাছে ফিরে গিয়ে সে মন্তব্য করে, “আমি এমন কিছু কথা শুনেছি, যা আমি আগে কখনো শুনিনি। শপথ খোদার, এটি কোনো কবিতা নয়, জাদু নয়, এমনকি কোনো জাদুকরের মন্ত্রও নয়। হে কোরাইশ, আমার কথা শোনো। এই লোকটিকে তার কাজের ওপর ছেড়ে দাও। সে যা বলছে, তার পেছনে এক বিশাল ভবিষ্যৎ লুকিয়ে আছে।” (ইবনে হিশাম, আস-সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ, ১/২৯২, দারুল জিল, বৈরুত, ১৯৯০)। বর্তমানকালেও এমন মানুষকে সত্যের পথ দেখাতে প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও বলিষ্ঠ যুক্তির প্রয়োজন হয়।

দ্বিতীয় বিরোধী পক্ষটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল মূলত হিজরতের পর মদিনার বুকে। এই দলটির নেতৃত্বে ছিল আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল, যারা মুনাফিক বা কপট বিশ্বাসী হিসেবে পরিচিত। মক্কার কাফেরদের মতো সম্মুখ লড়াই বা প্রকাশ্য শত্রুতার সাহস তাদের ছিল না। এ কারণে তারা প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের দাবি করে মুসলিম সমাজে মিশে যেত এবং গোপনে বিভেদ, ফিতনা ও গুজব ছড়ানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকত। মহানবীর প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে সমাজ সংস্কারের দৃশ্য ও ওহির আলোকচ্ছটা সত্ত্বেও তাদের অন্তর ছিল মোহগ্রস্ত ও অন্ধ। সমাজের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা এই চরম শত্রুদের গুপ্ত হামলার ভয়াবহতা তুলে ধরে সুরা মোনাফেকুনের ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তারাই প্রকৃত শত্রু, অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকো; আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন, তারা কোন দিকে বিভ্রান্ত হচ্ছে!”

পূর্বোল্লিখিত দুই শ্রেণির বাইরে আরেকটি পক্ষ ছিল, আরবিতে যাদের ‘সফাহ’ বা নির্বোধ বলা হয়। মূলত এদের প্রসঙ্গেই বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। পারিভাষিক ও আভিধানিক অর্থে ‘সফাহ’ বলতে লঘুচিত্ত, চপল ও অগভীর স্বভাবের ব্যক্তিদের বোঝায়, যাদের কোনো গাম্ভীর্য বা দূরদর্শিতা থাকে না। পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ৫ নম্বর আয়াতে এই শব্দটি প্রয়োগ করে বলা হয়েছে, “আর তোমরা নির্বোধদের হাতে তোমাদের ধন-সম্পদ তুলে দিয়ো না।” এই অজ্ঞ ও নির্বোধদের দলটি ছিল বিরোধীদের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য। তাদের বিরোধিতার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি ছিল না এবং তারা কোনো নীতি, মূল্যবোধ বা সামাজিক শিষ্টাচারের তোয়াক্কা করত না। নোংরা ও নিম্নমানের ব্যক্তিগত আক্রমণ, অকথ্য গালিগালাজ ও শারীরিক হেনস্তাই ছিল তাদের প্রধান অস্ত্র। কাবা প্রাঙ্গণে নবীজি (সা.) যখন নামাজে সিজদারত হতেন, তখন উকবা ইবনে আবি মুয়াইত তাঁর পিঠের ওপর পচা উটের নাড়িভুঁড়ি এনে চাপিয়ে দিত (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪০)। এছাড়া আবু লাহাব ও তার স্ত্রী মহানবীর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে নির্যাতন চালাত। মক্কার দীর্ঘ ১৩ বছরের জীবনে আবু জাহেলের মতো কুরাইশ নেতাদের ইন্ধনে এই ‘নির্বোধদের দল’ নবীজির ওপর অবর্ণনীয় কুরুচিপূর্ণ নির্যাতন চালিয়েছিল।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর