কিছু ফল ও সবজির ভেতর বিদ্যুৎ চলে কীভাবে?
বিজ্ঞান মেলাগুলোতে প্রায়ই কাগজের তৈরি কৃত্রিম আগ্নেয়গিরি কিংবা আলুর সাহায্যে ছোট বাতি জ্বালানোর চমৎকার প্রদর্শনী চোখে পড়ে। তরকারির একটি সাধারণ আলু কীভাবে আলো জ্বালাতে পারে, তা দেখে অনেকেই বিস্মিত হন। তবে আলু আসলে নিজে থেকে কোনো বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে না; বরং এর ভেতরে থাকা রাসায়নিক উপাদান নির্দিষ্ট ধাতুর সংস্পর্শে আসার পর তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি করে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, সব ফল বা সবজি কেন বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে না এবং কীভাবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়?
বিদ্যুৎ পরিবাহী মূলত বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। বাসা-বাড়িতে বিদ্যুৎ চলাচলের জন্য তামা কিংবা অ্যালুমিনিয়ামের মতো ধাতব তার ব্যবহৃত হয়, আবার রুপাও বেশ উৎকৃষ্ট পরিবাহী। অপর প্রকারটি হলো আয়নিক পরিবাহী, যা মুক্তভাবে বিচরণশীল আয়নের মাধ্যমে তড়িৎপ্রবাহ সচল রাখে। মানবদেহের টিস্যু কিংবা আলুর মতো বস্তু মূলত আয়নিক পরিবাহী হিসেবে কাজ করে আয়নিক সার্কিট তৈরি করে। এদের অভ্যন্তরে থাকা ইলেক্ট্রোলাইট বা তড়িৎ বিশ্লেষ্য উপাদান এই বিদ্যুৎ চলাচলের পথ তৈরি করে। পানিতে দ্রবীভূত হলে যে সমস্ত যৌগ আয়নে ভেঙে যায়, মূলত সেগুলোকেই ইলেক্ট্রোলাইট বলা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির ম্যাটেরিয়ালস সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাইকেল হিকনারের মতে, লবণের দ্রবণ যেভাবে সার্কিট সম্পন্ন করে বিদ্যুৎ পরিবহন করে, ফল ও সবজিও একই নিয়মে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতে পারে। প্রথাগত ধাতব তারের মতো সরাসরি ইলেকট্রন প্রবাহের বদলে লবণের দ্রবণে ভাসমান আয়নগুলোর চলাচলের মাধ্যমেই এই কাজটি ঘটে। আয়নিক পরিবাহীতে থাকা চার্জযুক্ত ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়নের ওপর ভোল্টেজ বা বৈদ্যুতিক চাপ প্রয়োগ করা হলে তারা সহজে ছুটতে পারে। যেমন খাবার লবণ পানিতে গুললে সোডিয়াম ও ক্লোরাইড আয়ন তৈরি হয়ে চমৎকার একটি আয়নিক দ্রবণ গঠন করে। এই দ্রবণ বা ইলেক্ট্রোলাইট যেকোনো জীবিত প্রাণীর ভেতরেই বিদ্যমান। এই কারণে তাত্ত্বিক দিক থেকে প্রায় সব শাকসবজি বা ফল বিদ্যুৎ পরিবাহী হলেও তাদের সক্ষমতা এক রকম হয় না। ঠিক একই কারণে সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ পানির তুলনায় লবণযুক্ত পানি বা সাধারণ কলের পানিতে বিদ্যুৎ অনেক দ্রুত চলে।
ফল বা সবজির সাহায্যে কার্যকর ব্যাটারি তৈরির জন্য পটাশিয়াম কিংবা সোডিয়ামের মতো আয়নসমৃদ্ধ এবং সহজে বিদ্যুৎ চলাচলের উপযোগী অভ্যন্তরীণ গঠনের উপাদান নির্বাচন করতে হয়। এই বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য একটি শক্ত আলু অত্যন্ত চমৎকার উপাদান। বিজ্ঞানী মাইকেল হিকনার জানান, পরীক্ষা চালানোর পূর্বে আলুকে যদি কিছুক্ষণ লবণ-পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়, তবে আলুর তড়িৎ পরিবাহী ক্ষমতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। কারণ লবণজলের সোডিয়াম ভেতরে প্রবেশ করে আয়ন চলাচলের পথকে আরও সাবলীল করে ব্যাটারিকে শক্তিশালী করে তোলে। অন্যদিকে টমেটোর অভ্যন্তরীণ গঠন বেশ রসালো ও অগোছালো। এমনকি কমলায় পর্যাপ্ত পটাশিয়াম থাকা সত্ত্বেও তা তড়িৎ পরিবহনে তেমন কাজে আসে না। নিউজার্সির রুটগার্স ইউনিভার্সিটির খাদ্য বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পল তাখিস্টভ এ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করেন, কমলালেবুর ভেতরের অংশ আলাদা কোষে বা কোয়ায় বিভক্ত থাকার কারণে আয়ন চলাচলের পথে বাধার সৃষ্টি হয়।
যেকোনো ফল বা সবজিতে প্রচুর আয়নিক উপাদান থাকলেও তা আপনা-আপনি ব্যাটারি হতে পারে না; বিভব পার্থক্য বা ভোল্টেজ তৈরির জন্য প্রয়োজন পড়ে দুটি ভিন্ন ধাতুর ইলেকট্রোড। যেমন একটি তামার মুদ্রা এবং দস্তার প্রলেপযুক্ত গ্যালভানাইজড পেরেক আলুর মধ্যে গেঁথে বাইরে থেকে তারের সাহায্যে যুক্ত করলে একটি পূর্ণাঙ্গ ইলেকট্রিক সার্কিট তৈরি হয়। ধাতুর শক্তির পার্থক্য এবং ফলের ভেতরের তরল তড়িৎ বিশ্লেষ্যের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় আয়নগুলো তারের মধ্য দিয়ে দ্রুত চলাচল করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। তবে লাইভ সায়েন্সের তথ্যমতে, একটি আলুর ব্যাটারি থেকে সাধারণত মাত্র ১.২ ভোল্টের মতো নগণ্য বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। ফলে এটি দিয়ে মুঠোফোন বা ট্যাবলেটের মতো যন্ত্র চার্জ করা সম্ভব নয়, কারণ তার জন্য সারিবদ্ধভাবে প্রচুর আলুর ব্যাটারি যুক্ত করার মতো জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে। তাই ফোনের ক্ষেত্রে সাধারণ চার্জার ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।