advertisement
advertisement

জলপথে দস্যুতা, চাঁদাবাজি ও প্রাণহানি: অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে নৌ পুলিশও


আলজাজিরা নিউজ বিডি -"রক্ত চক্ষুর চাহনি? সে তো ক্ষণিকের ধোঁয়া,সত্যের শিখা জ্বলে ওঠে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ" | প্রতিবেদক: Md. Zahangir Hasan প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৫:০৭ পূর্বাহ্ণ
জলপথে দস্যুতা, চাঁদাবাজি ও প্রাণহানি: অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে নৌ পুলিশও

advertisement

দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে অপরাধ চক্রের তৎপরতা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। মাছ ধরতে নেমে জলদস্যুদের গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছেন জেলেরা, চাঁদা না দিলে কুপিয়ে ও পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হচ্ছে নৌশ্রমিকদের। পণ্যবাহী নৌযানে ডাকাতি, সারসহ মালামাল লুট, অপহরণ, মাদক পাচার, ছিনতাই এবং অবৈধভাবে বালু তোলার মতো ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। এমনকি এসব অপরাধ দমনে গিয়ে চরম হামলার শিকার হচ্ছেন নৌ পুলিশের সদস্যরাও। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘ নৌপথে স্থলভাগের তুলনায় নজরদারি কম থাকায় অপরাধীরা জলপথকে নিরাপদ ভেবে বেছে নিচ্ছে, যার ফলে সন্ধ্যা নামলেই সাধারণ যাত্রী ও শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ভর করে।

নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, সারা দেশের জলপথকে ১১টি অঞ্চলে বিভক্ত করে দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে। এসব অঞ্চলে হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান, বালু উত্তোলন, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২০২৪ সালে ২ হাজার ৮৫টি মামলা নথিভুক্ত হয়। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৯৯টিতে, যা এক বছরের ব্যবধানে ১ হাজার ৩১৪টি বেশি। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ, দস্যুতা ও অপমৃত্যুর ঘটনায় আরও ৫০৫টি মামলা হয়েছে। আগের দুই বছরের সব মামলা এবং চলতি বছরের নয় মাসের এই পাঁচ ধরনের অপরাধ মিলিয়ে মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৮৯টিতে।

অঞ্চলভিত্তিক তথ্যে জানা গেছে, ২০২৪ ও ২০২৫ উভয় বছরেই সবচেয়ে বেশি মামলা রেকর্ড হয়েছে চাঁদপুর অঞ্চলে; যেখানে ২০২৪ সালের ৮৫০টি মামলা পরের বছর বেড়ে হয় ২ হাজার ১৭টি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বরিশাল অঞ্চলে মামলা ৪৪৮ থেকে বেড়ে ৬১১টিতে পৌঁছায়। ২০২৪ সালে চট্টগ্রামে ১৮২, ঢাকায় ১২০, ফরিদপুরে ১১৩, নারায়ণগঞ্জে ১০৬, রাজশাহীতে ৯০, সিলেটে ৫৮, কিশোরগঞ্জে ৪৯, টাঙ্গাইলে ৩৫ ও খুলনায় ৩৪টি মামলা হয়েছিল। ২০২৫ সালে ফরিদপুরে ১৪৭, ঢাকায় ১২৮, রাজশাহীতে ১২১, চট্টগ্রামে ১১৮, নারায়ণগঞ্জে ৯১, টাঙ্গাইলে ৬৬, সিলেটে ৪৫, কিশোরগঞ্জে ৩০ ও খুলনায় ২৫টি মামলা হয়। অন্যদিকে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে হত্যা, ডাকাতিসহ নির্দিষ্ট পাঁচ অপরাধে সর্বোচ্চ ৮৬টি মামলা হয়েছে ঢাকায়, নারায়ণগঞ্জে ৮২টি, বরিশাল ও রাজশাহীতে ৭০টি করে, ফরিদপুরে ৫৭টি, টাঙ্গাইলে ৩২টি, খুলনায় ৩০টি, চট্টগ্রাম ও কিশোরগঞ্জে ২৫টি করে, চাঁদপুরে ২২টি এবং সিলেটে ৬টি মামলা রেকর্ড করা হয়।

নৌপথে অপরাধের ভয়াবহতার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে ভোলার পূর্ব ইলিশায় মেঘনা নদীতে জলদস্যুদের গুলিতে প্রাণ হারান বাঘার হাওলা গ্রামের জেলে মো. হোসেন (৩০) এবং গুলিবিদ্ধ হন আব্বাস (৩২), কাঞ্চন (৩৪) ও সোহেল (২৯)। ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর চাঁদপুরের হাইমচরে এমভি আল-বাখেরা নামের সারবাহী জাহাজের সাত কর্মীকে গলা কেটে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া গত বছরের ১০ অক্টোবর নরসিংদীর মেঘনায় বাল্কহেড থেকে ৩১৭ মেট্রিক টন (প্রায় সাড়ে ছয় হাজার বস্তা) সার লুটের ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মল্লিক জানান, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, মুন্সিগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর ও বরিশালের সীমানাবর্তী দুর্গম চরাঞ্চলে জেলেনৌকা ও যাত্রীবাহী ট্রলারে প্রায়ই হামলা হয়। মা ইলিশ রক্ষা অভিযানের কারণে বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত থাকলেও অভিযান শেষে ঝুঁকি এড়াতে সার্বক্ষণিক টহল জোরদারের দাবি জানান তিনি।

অন্যদিকে চাঁদাবাজির বিষয়ে বাংলাদেশ বাল্কহেড মালিক সমিতির সহসভাপতি আহমাদুল কবির মোল্লা অভিযোগ করেন, মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে প্রতি নৌযান থেকে ২ হাজার টাকা, ভোলার ইলিশায় ৫০০ টাকা এবং সাভারের রুস্তমপুর ও আমিনবাজারে আড়াই হাজার টাকা করে টোলের নামে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। গত বছরের ৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের মেঘনায় চাঁদা না দেওয়ায় এমভি জয়নব বৃষ্টি পরিবহনের দুই শ্রমিক মহিবুল্লাহ ও জাকারিয়াকে কুপিয়ে আহত করা হয়। খবর পেয়ে চালিভাঙ্গা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির দল গেলে তাদের ওপরও টেঁটা ও বল্লম দিয়ে হামলা চালানো হয়, যাতে এএসআই মাকসুদ, কনস্টেবল সোহাগ ও সাইদুর আহত হন। পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়ে রানা ও সাজ্জাদ নামের দুজনকে আটক করে। এছাড়া চলতি বছরের ২১ এপ্রিল রাতে কুষ্টিয়ার হরিপুরে পদ্মায় অবৈধ বালু উত্তোলনবিরোধী অভিযানে গিয়ে পাবনার লক্ষ্মীকুণ্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পাঁচ সদস্য গুলিবিদ্ধ হন। গত ১৯ আগস্ট পিরোজপুরের কাউখালীতে টহল শেষে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাত ও ইটের আঘাতে কনস্টেবল জাকির হোসেন ও ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. আরমান হোসেনসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন।

বর্ষায় দেশের নৌপথের দৈর্ঘ্য সাড়ে সাত হাজার ও শুষ্ক মৌসুমে সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার হলেও নিয়মিত চলাচল থাকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারে। বিশাল এই এলাকা নিয়ন্ত্রণে নৌ পুলিশের ফাঁড়ি রয়েছে মাত্র ১২৪টি। অতিরিক্ত আইজিপি ও নৌ পুলিশ প্রধান মো. রেজাউল করিম জানান, চাঁদাবাজির ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা বা সাক্ষ্য দিতে না চাওয়ায় আদালতে দোষ প্রমাণ কঠিন হয়ে পড়ে; তবে মাদক ও অস্ত্র পাচার রোধে ডেটাবেজ তৈরি করে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের পুলিশ সুপার আলমগীর হোসেনের মতে, হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ রাতের আঁধারে নদীতে ফেলা হয় কিংবা স্রোতে ভেসে আসে, তবে সেখানে অন্যান্য অপরাধ তুলনামূলক কম। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক মনে করেন, অপরাধের প্রকৃত সংখ্যা পরিসংখ্যানে আসা সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। নদীপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতে নৌ পুলিশের জনবল, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের ঘাটতি পূরণ করে অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত অভিযানের তাগিদ দেন তিনি।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর