advertisement
advertisement

শিশুর ধর্মীয় শিক্ষার সূচনা: সঠিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন ও বর্জনীয় দিকসমূহ


আলজাজিরা নিউজ বিডি -"রক্ত চক্ষুর চাহনি? সে তো ক্ষণিকের ধোঁয়া,সত্যের শিখা জ্বলে ওঠে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ" | প্রতিবেদক: Md. Zahangir Hasan প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৩:৩৯ অপরাহ্ণ
শিশুর ধর্মীয় শিক্ষার সূচনা: সঠিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন ও বর্জনীয় দিকসমূহ

advertisement

সন্তানের হৃদয়ে ধর্মীয় অনুশাসন ও উন্নত নীতিবোধের ভিত গড়ে তোলা প্রতিটি মুসলিম মা-বাবার অপরিহার্য কর্তব্য। তবে এই শিক্ষা কোথা থেকে এবং কীভাবে অর্জিত হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করে ভবিষ্যৎ জীবনের গতিপথ। আবেগের বশে বা জোরজবরদস্তি করে ধর্ম শেখানোর চেষ্টা অনেক সময়ই বিপরীত ফল বয়ে আনে। এ বিষয়ে সতর্ক করে বিখ্যাত তাবেয়ি মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই এই ইলমই হলো ধর্ম; সুতরাং তোমরা লক্ষ করো, কার কাছ থেকে তোমরা তোমাদের ধর্ম গ্রহণ করছ।’ (সহিহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা, ১/১৪, দারুল ইহইয়ায়িত তুরাস আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৭২)।

সন্তানের জন্য প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষক নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘রদ্দুল মুহতার’-এ সুস্পষ্টভাবে এসেছে, মা-বাবার কর্তব্য হলো সন্তানের জন্য এমন একজন খোদাভীরু ও প্রজ্ঞাবান শিক্ষক বেছে নেওয়া, যিনি কেবল গ্রন্থ পাঠ করাবেন না, বরং নিজের উত্তম চরিত্রের ছাপ ফেলবেন শিশুর মনে (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ৬/৪২৭, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাছাইয়ে বেশ কয়েকটি ইতিবাচক বিষয় নজরে রাখা জরুরি। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে পড়ালেখার চেয়ে আনন্দঘন ও মমতাময় পরিবেশ মুখ্য হওয়া উচিত, যেখানে খেলার ছলে শিক্ষাদান চলবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা সহজ করো, কঠিন কোরো না; সুসংবাদ দাও, দূরে সরিয়ে দিয়ো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৯)। পাশাপাশি কেবল মুখস্থ করানো নয়, বরং শিষ্টাচার ও ‘আদব’ গঠনে মনোযোগী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা শ্রেয়। তবে সন্তানের প্রাথমিক শিক্ষালয় হলো তার নিজের গৃহকোণ। এছাড়া দীর্ঘ পথযাত্রার ক্লান্তি পরিহার করতে ঘরের কাছাকাছি এবং অনাবাসিক প্রতিষ্ঠান অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। রাসুল (সা.) ধর্মশিক্ষার জন্য আসা তরুণদের সর্বোচ্চ ২০ দিন অবস্থানের অনুমতি দিয়ে পরিবারের আকুলতা বুঝে বাড়ি ফিরে যেতে বলেছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদের দ্বীন শেখানো ও নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন (সহিহ্ মুসলিম, হাদিস: ৬৩১)।

বিপরীতে যেসব প্রতিষ্ঠানে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়, সেগুলো পরিহার করা আবশ্যক। পাঁচ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু যদি প্রতিদিন স্কুলে যেতে অনীহা দেখায় বা কান্নাকাটি করে নিয়মিত অনুপস্থিত থাকে, তবে বুঝতে হবে সে সেখানে স্বস্তিতে নেই। জোর করে পাঠানো হলে অবচেতনভাবেই শিশুর মনে ধর্মের প্রতি একধরনের দীর্ঘস্থায়ী ট্রমা তৈরি হতে পারে। সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন এ বিষয়ে লিখেছেন, শিক্ষাদানে মাত্রাতিরিক্ত কড়াকড়ি ও বলপ্রয়োগ শিশুর স্বতঃস্ফূর্ততা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দেয়; শাস্তির আতঙ্কে শিশু মিথ্যা বলতে শেখে এবং তার আত্মসম্মানবোধ বিনষ্ট হয় (আল-মুকাদ্দিমা, পৃষ্ঠা ৫৪১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৩)।

অতিরিক্ত সিলেবাস ও আমলের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া প্রতিষ্ঠানও সন্তানের জন্য অনুপযুক্ত। হানাফি ফিকহের গ্রন্থ ‘আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়া’ অনুসারে, শিশুদের ওপর তাদের সাধ্যের অতিরিক্ত শারীরিক কিংবা মানসিক কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করা যাবে না, কারণ শরিয়ত তাদের ওপর এমন বোঝা চাপায়নি (৫/৩৫৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০)। একই সঙ্গে যেখানে কেবল বাহ্যিক আচার নিশ্চিত করতে গিয়ে রূঢ় আচরণ করা হয়, তা পরিহার করতে হবে। মহানবী (সা.) নামাজের সিজদায় থাকা অবস্থায় পিঠে শিশু চড়ে বসলেও বিরক্ত না করে দীর্ঘক্ষণ সিজদা বাড়িয়ে দিতেন।

সন্তানকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর পরই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং শিক্ষক ও পরিবেশ নিয়ে শিশু আনন্দিত কি না, তার সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখা প্রয়োজন। শিশু কোনো প্রতিষ্ঠানে খাপ খাওয়াতে না পারলে বকাঝকা না করে তার মানসিক অবস্থা বোঝা উচিত। প্রয়োজনে সাময়িক বিরতি দিয়ে ঘরে স্নেহশীল গৃহশিক্ষকের সহায়তায় শিক্ষাদান শুরু করা যেতে পারে। কারণ ধর্মীয় শিক্ষার মূল লক্ষ্য কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মহান স্রষ্টার প্রতি গভীর অনুরাগ সৃষ্টি করা; ভুল প্রতিষ্ঠান বা রুক্ষ আবহ শিশুকে চিরতরে ধর্মবিমুখ করে তুলতে পারে।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর