advertisement
advertisement

সাজেকে টানা সাত দিনের অবরোধ: খাদ্যসংকটের শঙ্কা, মারাত্মক ক্ষতির মুখে কৃষক ও পরিবহন শ্রমিকেরা


আলজাজিরা নিউজ বিডি -"রক্ত চক্ষুর চাহনি? সে তো ক্ষণিকের ধোঁয়া,সত্যের শিখা জ্বলে ওঠে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ" | প্রতিবেদক: Md. Zahangir Hasan প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩:৩৮ অপরাহ্ণ
সাজেকে টানা সাত দিনের অবরোধ: খাদ্যসংকটের শঙ্কা, মারাত্মক ক্ষতির মুখে কৃষক ও পরিবহন শ্রমিকেরা

সাজেকে অবরোধ সমর্থনে সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ। আজ সকালে সাজেকের মাচালং ১৪ কিলো এলাকায়

advertisement

রাঙামাটির সাজেক পর্যটন এলাকায় টানা সাত দিন ধরে চলছে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি। আজ বুধবার সকালেও সাজেকগামী সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ ছিল। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচির কারণে স্থানীয় জনপদে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে উৎপাদিত কৃষিপণ্য হাটে নিয়ে যেতে না পেরে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় জুমচাষিরা। পর্যটকবাহী কয়েক শ গাড়ির চালক ও সহকারীরা আয় হারিয়ে ধারদেনা করে কোনোমতে দিন পার করছেন এবং যানবাহনের মাসিক কিস্তি মেটানো নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মালিকেরা।

সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে এ অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দিয়েছে, যা তাদের আন্দোলনের তৃতীয় দফা। সামগ্রিক নিরাপত্তাঝুঁকির কথা মাথায় রেখে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটক প্রবেশ সাময়িকভাবে স্থগিত করলে পর্যটকেরা আগেই এলাকা ত্যাগ করেন। স্থানীয় খাদ্য পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অনিত্য ত্রিপুরা জানান, বাসিন্দারা ঘরে থাকা খাবার দিয়ে দিন যাপন করছেন। রুইলুই পাড়ার পাঁচটি মুদিদোকানের মালামাল প্রায় শেষের পথে। অবরোধ আর এক-দুই দিন অব্যাহত থাকলে পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।

১৬৯ নম্বর শিয়ালদাই মৌজার হেডম্যান ও সাজেক ইউপির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জৌপেইথাং ত্রিপুরার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ওয়ার্ডের ২২টি পাড়ার অধিকাংশ মানুষই জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। অবরুদ্ধ অবস্থার কারণে মাচলং বাজারে কৃষিপণ্য পরিবহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে কলা, পেঁপে, আখ, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া ও কচু বিক্রি করতে না পেরে চাষিরা বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং বহু ফসল গাছেই পচে নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে নাপ্পি, শুঁটকি, অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধসহ নিত্যব্যবহার্য পণ্যের টান পড়েছে।

যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় খাগড়াছড়ির পরিবহন খাতের শ্রমিকেরা চরম বিপর্যয়ে পড়েছেন। মাটিরাঙ্গার তবলছড়ির পিকআপ চালক ইসমাইল হোসেন জানান, দৈনিক ভিত্তিতে গাড়ি চালিয়ে তিনি প্রতিদিন এক থেকে দুই হাজার টাকা উপার্জন করতেন। অসুস্থ বাবা, দাদি ও দুই ছোট ভাইসহ আট সদস্যের সংসারে এখন আয়ের পথ বন্ধ। পরিচিত এক ব্যক্তির কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে কোনোমতে টিকে আছেন তিনি। পিকআপের সহকারী মো. শাকিল খন্দকার জানান, সাজেকে গাড়ি চললে দৈনিক ৬০০ টাকা পেতেন, যা দিয়ে চার সদস্যের সংসার ও বাড়িভাড়া চলত; এখন তাঁকেও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। চাঁদের গাড়ির চালক অংগোজাই মগ জানান, রোজগার না থাকায় তিনি দিনমজুরি করার কথা ভাবছেন। অর্থাভাবে প্রবারণা পূর্ণিমা পালন করতে পারেননি এবং আসন্ন কঠিন চীবর দান উদ্‌যাপন নিয়েও তিনি অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। এদিকে নিজস্ব জমানো টাকার সঙ্গে আট লাখ টাকা ঋণ নিয়ে পিকআপ কেনা মো. মুন্না জানান, প্রতি মাসে ৩২ হাজার টাকার কিস্তি কীভাবে দেবেন, তা নিয়ে তিনি দিশাহারা।

খাগড়াছড়ির যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা তথ্য দেন, তাঁদের সংগঠনে ২৫০টি এবং জিপ মালিক সমিতির আওতাধীন ৫০০টির বেশি গাড়িসহ মাহিন্দ্র, চাঁদের গাড়ি ও সিএনজি মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজারের অধিক যানবাহন সাজেক সড়কে চলে। এ অচলাবস্থায় চালক-শ্রমিকদের জীবিকা বন্ধের পাশাপাশি ঋণগ্রস্ত মালিকেরা বিপদে পড়েছেন এবং জেলায় পরিবহন খাতে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কর্মসূচি চলবে। আজ বুধবারও ১০ নম্বর হাজাছড়াসহ বিভিন্ন পয়েন্টে পিকেটাররা অবস্থান নিয়েছেন।

উল্লেখ্য, তিন দফা দাবিতে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন গত ১১ অক্টোবর প্রথম দফায় এক দিন এবং ১৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফায় অবরোধ করে। শারদীয় দুর্গাপূজার কারণে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর তা স্থগিত থাকার পর গত বুধবার সংগঠন দুটি পরদিন বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ঘোষণা করে। ওই ঘোষণার পর প্রশাসনের নির্দেশে গত বৃহস্পতিবার সকালে পর্যটকেরা সাজেক ত্যাগ করার সময় উজো বাজার এলাকায় গুলির ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করলেও সংগঠনটি তা অস্বীকার করে। পরে সাজেকে অবরোধ চলাকালীন হামলা, লাঠিপেটা এবং বাড়িঘর-দোকানপাটে ভাঙচুরের প্রতিবাদে ও সাজেকবাসীর দাবির সমর্থনে গত শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে অর্ধদিবস অবরোধ পালন করে ‘ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদ’। সামগ্রিক বিষয়ে সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানান, অবরোধ চলমান থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর