বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ১০ অক্টোবর ২০২৬, নয়াদিল্লি
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে পুলিশ তাঁদের ওপর ব্যাপক ধরপাকড় চালায়। আন্দোলনকারীদের প্রধান অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ বা এসআইআর কর্মসূচির মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাগরিকের নাম মুছে ফেলা হয়েছে। এর আগে ২০০৩-০৪ সালে এমন নিবিড় সংশোধন হলেও এবারের উদ্যোগটি এর ব্যাপকতা, বিধিমালার স্বেচ্ছাচারী প্রয়োগ এবং অতিরিক্ত ক্ষমতা চর্চার কারণে নজিরবিহীন রূপ নিয়েছে। ফলে মুসলমান, নারী, অভিবাসী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে ভোটাধিকার হারিয়েছে, যা বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিজয়ের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দল এই প্রক্রিয়াকে ‘শুদ্ধীকরণ’ হিসেবে তুলে ধরলেও জাতপাতভিত্তিক সমাজে এমন পদক্ষেপ নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকারসম্পন্ন এবং অধিকারহীন—এই দুই ভাগে বিভক্ত করছে। দার্শনিক জর্জিও আগামবেনের ধারণার মতো, এসব মানুষ কার্যত কোনো রাজনৈতিক অধিকার ছাড়া নিছক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা নাগরিকে পরিণত হচ্ছেন। শুরুতে নির্বাচন কমিশন অতিরিক্ত মানুষের অন্তর্ভুক্তির আশঙ্কায় আধার কার্ড গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ‘যৌক্তিক অসংগতি’ বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ নামে নতুন শ্রেণি তৈরি করে তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ৯০ লাখ নামের মধ্যে ২৭ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশই মুসলমান। এসব সিদ্ধান্তের বিপরীতে জমা হওয়া ৩৮ লাখের বেশি আবেদনের নিষ্পত্তির জন্য মাত্র ১৯টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল থাকায় ভুক্তভোগীদের পক্ষে প্রতিকার পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোটার তালিকায় নাম ধরে রাখতে শিক্ষাগত সনদ, জমির দলিল, পুরোনো কাগজপত্র ও বংশতালিকা চাওয়ার কারণে দরিদ্র, নিরক্ষর ও ভূমিহীন মানুষেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতার কথা বলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ‘ইআরওনেট’ ব্যবস্থার মাধ্যমে অসংগতি চিহ্নিতকরণ, অ্যাপ ও ডিজিটাল নথির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও বৈষম্যপূর্ণ সমাজে সবার প্রযুক্তি ব্যবহারের সমান সুযোগ নেই। তাছাড়া বিয়ের পর নাম ও ঠিকানা বদল হওয়ায় উপযুক্ত নথির অভাবে নারীদের ভোটাধিকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, হায়দরাবাদে ‘অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত ও দ্বৈত’—এই চার ক্যাটাগরিতে চিহ্নিত ১৯ লাখ ৪০ হাজার নামের মধ্যে প্রায় ৪০.৭ শতাংশই মুসলিম, অথচ শহরে তাদের জনসংখ্যা ৩০ শতাংশ। পুরোনো হায়দরাবাদের কিছু এলাকায় এই হার ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। এছাড়া দিল্লি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের খসড়া তালিকা থেকে আগের ভোটারদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নাম উধাও হয়ে গেছে।
গত ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত সমাবেশে অংশ নেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর ধ্রুব রাঠী, অভিনেতা-রাজনীতিক প্রকাশ রাজ এবং সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেসহ অনেকে। নির্বাচনী বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নাম কর্তনের মাধ্যমে বিজেপির প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভোটভিত্তি দুর্বল করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের নির্বাচনের আগে পুরোনো তালিকা থেকে ৬৮ লাখ নাম বাদ এবং ২১ লাখ নতুন নাম অন্তর্ভুক্তির পর বিজেপি জোটের ব্যবধান প্রায় ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। একইভাবে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিজেপির দুর্বল আসনগুলোতে দরিদ্র ও সংখ্যালঘু ভোটাররাই বেশি নিশানা হয়েছেন এবং দলটির বিজয়ী অনেক আসনেই জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বেশি ছিল।
এই পদক্ষেপ ‘বিশুদ্ধ হিন্দু’ রাষ্ট্র গঠনের রাজনৈতিক লক্ষ্যকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি ‘রোহিঙ্গা’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘বাংলাদেশি’ শব্দ ব্যবহার করে মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, যদিও বাঙালি হিন্দুসহ অন্যরাও তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। এমনকি বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে নাম বাদ পড়াদের সরকারি গণবণ্টনব্যবস্থার (রেশন) সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও উঠেছে। ইতিপূর্বে আসামে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পরিচালিত জাতীয় নাগরিক পঞ্জি থেকে বাদ পড়া ১৯ লাখ মানুষের বড় অংশই বাংলাভাষী ছিলেন, যাঁরা কার্যত রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েন। একই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং সম্প্রতি গঠিত জনমিতিক পরিবর্তনবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের কমিটিও কাজ করছে। জার্মানির গ্যোটিঙেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আলেকজান্ডার ফন হুমবোল্টের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তানভীর ফজল আল-জাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধে উল্লেখ করেন, ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষকে অধিকারহীন করার এই তৎপরতা ভারতের গণতন্ত্রকে ভেতর থেকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।