advertisement
advertisement

মল্লযুদ্ধের রূপ নেওয়া রাজনীতি: আগ্রাসী ভাষা ও ঐতিহাসিক ক্ষতের ব্যবচ্ছেদ


আলজাজিরা নিউজ বিডি -"রক্ত চক্ষুর চাহনি? সে তো ক্ষণিকের ধোঁয়া,সত্যের শিখা জ্বলে ওঠে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ" | প্রতিবেদক: Md. Zahangir Hasan প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ
মল্লযুদ্ধের রূপ নেওয়া রাজনীতি: আগ্রাসী ভাষা ও ঐতিহাসিক ক্ষতের ব্যবচ্ছেদ

advertisement

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন বর্তমানে এক ধরনের মল্লযুদ্ধের রূপ ধারণ করেছে। সেখানে পরস্পরকে ঘায়েল করার প্রচেষ্টা, বাক্যবাণ ও কঠোর শব্দচয়ন কেবল উদ্বেগজনকই নয়, রীতিমতো আতঙ্ক জাগানিয়া। নদ-নদী, শিশিরভেজা ধানখেত কিংবা শান্ত প্রকৃতির এই দেশে সাধারণ মানুষের জীবনধারা স্বভাবতই নম্র। সাহিত্য ও শিল্পের অনুরাগী একটি জনপদে রাজনীতির মঞ্চে পৌঁছালে ভাষা কেন এত নির্মম ও সংঘাতময় হয়ে ওঠে—এর উত্তর নিহিত রয়েছে ইতিহাসের বহু পুরনো ক্ষত এবং ক্ষমতার ধারাবাহিক দ্বন্দ্বের গভীরে।

ঔপনিবেশিক শাসন, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন, অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান এবং গণতন্ত্রের জন্য রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মতো একের পর এক সংকটের মধ্য দিয়ে এই ভূখণ্ডের পথচলা। দীর্ঘদিনের এই অস্থিরতার কারণে এখানে রাজনীতি সাধারণ মতপার্থক্য ছাড়িয়ে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়েছে। আত্মরক্ষার তাড়না থেকেই প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে শত্রু ভাবার প্রবণতা তৈরি হয়, যার ফলে রাজনৈতিক বক্তৃতাগুলো চিন্তার বিকাশের চেয়ে সমর্থকদের উত্তেজিত করার হাতিয়ার বা গুলিতে রূপ নিয়েছে।

সমঝোতাহীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এই বিদ্বেষকে আরও উসকে দিয়েছে। ভিন্নমতকে ইতিবাচক বিতর্কের মাধ্যমে মোকাবিলার বদলে চলছে তাচ্ছিল্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণ। বটতলায় বসে সাধারণ মানুষ সহজেই মতপার্থক্য ভুলে আড্ডা দিতে পারলেও রাজনীতির ময়দানে সেই উদারতা অনুপস্থিত। ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নয়, বরং প্রভাব, মর্যাদা ও সুরক্ষার প্রতীক হওয়ায় তা হারানোর ভীতি নেতাদের আক্রমণাত্মক ও উচ্চকণ্ঠ হতে বাধ্য করে। কারণ শান্ত নদীর চেয়ে মানুষ বন্যার তীব্রতা বেশি মনে রাখে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এই আক্রমণাত্মক বাচনভঙ্গিকে আরও তীব্র করেছে। সংযত আলোচনার চেয়ে ক্রোধ ও অপমানজনক বক্তব্য অনলাইনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বিধায় রাজনীতির ভাষা এখন সংক্ষিপ্ত, ঝাঁঝালো ও বিভাজনমূলক হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ, ক্ষমতার পালাবদল এবং নির্যাতনের স্মৃতি থেকে তৈরি হওয়া ঐতিহাসিক ক্ষোভ ও দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন সমাজের সহনশীলতা কমিয়ে এনেছে। ফলে ধৈর্য নিয়ে জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে সহজ ভাষায় শত্রু চিহ্নিত করার প্রবণতা বাড়ছে।

সাধারণ কৃষক, শ্রমিক, মাঝি কিংবা শিক্ষার্থীদের জীবনসংগ্রামের ভাষায় যেখানে বেঁচে থাকার ও আগামীর স্বপ্ন থাকে, রাজনৈতিক মঞ্চে সেখানে জায়গা করে নেয় ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ। তবে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, নদীর গতির মতো ভাষাও পরিবর্তনশীল। বিরোধিতা মানেই স্থায়ী শত্রুতা নয়—এই বোধ জাগ্রত হলে এবং নেতাদের আক্রমণাত্মক ভাষা পরিহারের সদিচ্ছা থাকলে রাজনীতির ভাষাও দেশের শান্ত প্রকৃতির মতো সংলাপে মুখর ও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।

advertisement
advertisement

জাতীয় বিভাগের আরো খবর