২০২২ সালের বর্ষাকালের মাঝামাঝি এক পড়ন্ত বিকেলে তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওরে ১৫-১৬ জন তরুণের একটি দল নৌকায় চড়েছিল। সবে বৃষ্টি থেমে যাওয়া সেই অপরাহ্নে জলমগ্ন হাওরের বুকে ছড়িয়ে পড়েছিল গোধূলির সোনালি আভা আর ভেজা বাতাসের সুবাস। মেঘের শেষ অবশিষ্টাংশ তখন ভেসে যাচ্ছিল দূর সীমান্তের পর্বতের দিকে। নৌকার ছাদে বসে থাকা দুই তরুণের মনে তখন কৌতুহল জেগেছিল—ওই মেঘের উৎপত্তি কোথায়, আর কী-ই বা লুকিয়ে আছে সীমান্তের ওই শৈলমালার ওপারে? রাতে সীমান্তের বাতিগুলো যখন জ্বলে উঠল, তখন সেই অচেনা ভূখণ্ডের আলোকরশ্মি তাঁদের মেঘের দেশে যাওয়ার বাসনাকে আরও তীব্র করে তোলে। অবশেষে ২০২৩ সালে সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হয় এবং দলটি প্রথমবারের মতো মেঘালয়ে পা রাখে। তবে পরবর্তী সময়ে বারবার ফিরে আসা এই ভূখণ্ডটিতে কেবল স্থান ভ্রমণ নয়, বরং জড়িয়ে ছিল নিজেদের নতুন করে চেনার এক অবিরাম তাগিদ।
সম্প্রতি আবারও ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ডাউকিতে প্রবেশ করতেই তাঁদের স্বাগত জানান বহুদিনের পরিচিত চালক ও গাইড, হাস্যোজ্জ্বল নেপালি যুবক সানি গুরুং। ডাউকি বাজারে প্রাতরাশ সম্পন্ন ও মুদ্রা বিনিময়ের পর শিলংয়ের উদ্দেশে শুরু হয় যাত্রা। মাউলিনং, রিওয়াই লিভিং রুট ব্রিজ, স্নোংপেডেং কিংবা এলিফ্যান্টস ফলসের মতো স্থানগুলো আগেই ঘুরে দেখার কারণে এবারের ভ্রমণতালিকা ছিল তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত। পথিমধ্যে উমগটের ঝুলন্ত সেতু অতিক্রম করার সময় বাংলাদেশের প্রান্ত থেকে দূর পাহাড়ে সেতুটি দেখার পুরোনো স্মৃতি ও অনুভূতি নতুন রূপ পায়।
ডাউকি ছেড়ে সানির গাড়ি পাহাড়ি ঢাল বেয়ে ওপরের দিকে উঠতেই মেঘপুঞ্জের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তীক্ষ্ণ ও বিপজ্জনক বাঁকযুক্ত পাহাড়ি রাস্তায় তীব্র কুয়াশার মধ্যেও চালকদের মাঝে হর্ন বাজানো কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের কোনো তাড়া ছিল না। পথে দেখা মিলল স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষদের, যাঁরা ধীরস্থিরভাবে পাথর, ভেজা মাটি, ভাঙা সড়ক ও জুম চাষের ফসল সামলে নিজেদের দৈনন্দিন কাজ করছিলেন। চারপাশের বুনো গুল্ম আর পুষ্পশোভিত প্রকৃতিযাত্রীদের নিয়ে গাড়ি একসময় পৌঁছে যায় চেরাপুঞ্জিতে।
চেরাপুঞ্জিতে সেদিন মেঘ আর কুয়াশার দাপটে নোহকালিকাই জলপ্রপাত প্রায় অস্পষ্ট হয়ে পড়েছিল। বৃষ্টিভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ এবং বুনো বাতাসের ভেতর খাড়া গিরিখাতের কিনারায় পাথরে পা ঝুলিয়ে বসে থাকা পর্যটকদের স্মৃতিতে তখন অনুরণিত হচ্ছিল কবি জীবনানন্দ দাশের পঙ্ক্তি—‘যে-জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের—মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা’। এই নির্জনতায় পদ্মার ওপারে নিজেদের শেকড় ছেড়ে আসার বেদনা, অতীতের হারিয়ে যাওয়া প্রেম এবং ‘প্রকৃত জল খুঁজে বেড়াই জলজ বৃক্ষের মতো’ বেঁচে থাকার অস্তিত্বসংকট চোখের জলে মিশে সৃষ্টি করেছিল এক অনন্য কৃতজ্ঞতাবোধ।
ভ্রমণের একপর্যায়ে দলটি পরিদর্শন করে উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন ডন বসকো মিউজিয়াম। সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের জন্য নিবেদিতপ্রাণ সন্ত জন বসকোর আদর্শে প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরে রয়েছে ১৭টি থিমভিত্তিক গ্যালারি। সেখানে খাসি, গারো, জয়ন্তিয়া, নাগা, মিজো এবং বোড়োসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর রঙিন পোশাক, প্রাচীন গহনা, শিকারের অস্ত্র, বাঁশ-বেতের কৃষি সরঞ্জাম ও দুর্লভ বাদ্যযন্ত্রের বিপুল সংগ্রহ প্রদর্শিত রয়েছে। একই সঙ্গে জাদুঘরের ছাদ থেকে উপভোগ করা যায় শিলং শহরের চমৎকার প্যানোরামিক দৃশ্য।
এরপর শিলং-গুয়াহাটি মহাসড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় পাইনবনের আড়াল ভেঙে ধরা দেয় ষাটের দশকের শুরুতে উমিয়াম নদীর ওপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অংশ হিসেবে নির্মিত বিখ্যাত উমিয়াম লেক বা ‘বড়াপানি’। পূর্ব খাসি পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এই লেকের অদূরেই রয়েছে পাইন ঘেরা সবুজ তৃণভূমি ‘লুমের পিংগাদ’, যা ভ্রমণপিপাসুদের মাঝে মেঘালয়ের ‘মিনি পেহেলগাম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এর আগে শিলংয়ের ‘এমএল জিরো ফাইভ’ বা বাইকার্স ক্যাফেতে গরম কফি পানের ফাঁকে ধর্মশালায় বসবাসকারী তিব্বতি অধিকারকর্মী এক তরুণীর সঙ্গে পরিচয় তাঁদের বিশ্ব ও পরিচয়ের সীমানাকে নতুন দৃষ্টিকোণ দেয়। গভীর রাতে প্রায় ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার লোয়ার সোহরার মেঘাচ্ছন্ন নীরবতা পেরিয়ে ফেরার দিনে সানি গুরুং তাঁদের নিয়ে যান এক নতুন পথে। সেই পথে দেখা মেলে এমন এক সেতুর, যা প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর আগে বাংলাদেশের বিছনাকান্দি থেকে বহু দূরে মেঘের কোলে অস্পষ্টভাবে দেখা যেত। স্মৃতি ও বাস্তবের সেই যোগসূত্র মেলাতে মেলাতেই তাঁদের মেঘালয় ভ্রমণের সমাপ্তি ঘটে।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।