মন স্থির রাখার একটা ভালো উপায় কিছু পড়া
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা পুরো দিনের স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত করতে পারে। স্কুলে দেরিতে পৌঁছানো, বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া, যত্ন করে করা বাড়ির কাজ ফেলে আসা কিংবা অসাবধানতায় পানির বোতল খুলে বইখাতা ভিজে যাওয়ার মতো ক্ষুদ্র ঘটনাও মন বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। মনোবিজ্ঞানীরা জানান, কোনো একটি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা ঘটলে মানুষের মস্তিষ্ক অনেক সময় পরবর্তী সব কিছুকেই তার সঙ্গে মিলিয়ে ভাবতে থাকে। একজন মনোবিজ্ঞানীর ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল, সারা দিনের ব্যস্ততায় বাজার ভুলে যাওয়া, রান্নাঘরে ডিম ভেঙে ফেলা, পছন্দের বাটি ভাঙা এবং পরে কাচের টুকরোয় পা কেটে রক্তাক্ত হওয়ার পর তিনি পুরো বিশ্বকেই নিজের প্রতিকূল ভাবতে শুরু করেছিলেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বিচ্ছিন্ন খারাপ ঘটনার কারণে পুরো দিন নষ্ট বলে ধরে নেওয়া সমীচীন নয়; বরং কিছু নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে চললে এই মানসিক চাপ সহজেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
প্রথম কৌশলটি হলো নিজের পরিস্থিতি সঠিকভাবে অনুধাবন করা। মনোবিজ্ঞানী ম্যাথিউ লেহির মতে, প্রথম অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি হয়তো কারও নিয়ন্ত্রণে ছিল না, কিন্তু পরবর্তীতে মস্তিষ্ক অন্যান্য ঘটনাকে এর সঙ্গে জুড়ে দিয়ে পুরো দিনটিকেই ‘খারাপ’ হিসেবে প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়। তাই ‘আজকের দিনটাই খারাপ’ না বলে ‘সকালে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, তাই খারাপ লাগছে’—এভাবে চিহ্নিত করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে। ২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মনের চিন্তাগুলোকে কেবল ক্ষণস্থায়ী ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করতে না পারার সঙ্গে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। দ্বিতীয় কৌশলটি হলো অনুভূতি লিখে রাখা কিংবা সচেতন মনোযোগের (মাইন্ডফুলনেস) চর্চা করা। ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, নার্সিংয়ের শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে পাঁচ দিন আধা ঘণ্টা করে মাইন্ডফুলনেস চর্চা করায় তাঁদের শরীরে মানসিক চাপের হরমোন ‘কর্টিসল’ এবং অনুভূতির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এমনকি নিয়মিত এই অনুশীলন ছুটির দিনের তুলনায় কর্টিসল ও প্রদাহের উপাদান কমাতে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
তৃতীয়ত, একই স্থানে দীর্ঘক্ষণ বসে না থেকে স্থান পরিবর্তন কিংবা বাইরে হাঁটা মনোযোগের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। ২০২৩ সালে ১০০ জন ব্যক্তির ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রকৃতি বা শহরের পরিবেশে ৩০ মিনিট হাঁটার পর উভয় দলের মানুষেরই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার উন্নতি হয়েছিল এবং খারাপ লাগার অনুভূতি কমেছিল। চতুর্থ কৌশল হলো শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানো। মনোবিজ্ঞানী ম্যাথিউ লেহি উল্লেখ করেন, শরীর নাড়াচড়া করলে মানসিক চাপের সময় তৈরি হওয়া শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ ঘটে। ২০২১ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৮৩ জন তরুণ ট্রেডমিলে ৩০ মিনিট ব্যায়াম করার পর চাপের মুখোমুখি হলে, যাঁদের ব্যায়ামের তীব্রতা বেশি ছিল তাঁরা প্রায় ৮১ মিনিটে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেন; যেখানে হালকা ব্যায়ামকারীদের সময় লেগেছিল প্রায় ৯১ মিনিট।
পঞ্চম পদ্ধতি হিসেবে প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আকাশ, গাছের পাতার নড়াচড়া বা বাতাসের অনুভূতি স্নায়ুকে শান্ত করে এবং দিনের আলো শরীরের স্বাভাবিক ঘুম ও জাগরণের চক্র ঠিক রাখতে সাহায্য করে। ষষ্ঠ কৌশলটি হলো ধীরলয়ে শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ। শ্বাস নেওয়ার তুলনায় শ্বাস ছাড়ার সময় দীর্ঘায়িত হলে শরীর শিথিল হয়। ২০২৩ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় ১১১ জন ব্যক্তি এক মাস ধরে প্রতিদিন ৫ মিনিট বিভিন্ন শ্বাসের কৌশল চর্চা করেন। দীর্ঘ সময় ধরে শ্বাস ছাড়ার চর্চাকারীরা দিনের অন্যান্য সময়েও অপেক্ষাকৃত ধীরলয়ে শ্বাস নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এছাড়া ২০২২ সালে প্রকাশিত ৯৯টি গবেষণার এক পর্যালোচনায় উঠে আসে, প্রতিকূল পরিস্থিতিকে ইতিবাচক বা নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করা মানুষেরা সাধারণত বেশি সুখী হন এবং তাঁদের উদ্বেগ কম থাকে। বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেন, মন খারাপ হলে তা দ্রুত ভালো করার জন্য অতিরিক্ত তাড়াহুড়া বা জোর করা উচিত নয়; বরং খারাপ মুহূর্তকে স্বীকার করে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসাই কার্যকর উপায়।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।
নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ নিউজ প্রকাশ হলে তাৎক্ষণিক সতর্কতা পাবেন।